আসিয়ান প্রতিরক্ষা বৈঠকের শেষ দিনে ফের উত্তেজনা চীন-ফিলিপাইনের
গণমাধ্যম ডেক্স
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধের জেরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আবারও সামনে এসেছে। আসিয়ানের দুই দিনব্যাপী প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকের শেষ দিনে এক ফিলিপিনো রাজনীতিকের বিরুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে বেইজিং।
তবে ম্যানিলা বলছে, বৈঠকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ফিলিপাইনের সেবুতে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে এ উত্তেজনা প্রকাশ পায়।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ফিলিপাইনের এক ‘স্বার্থপর’ রাজনীতিক আসিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সম্প্রসারিত বৈঠকে চীনের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছেন। তবে ওই রাজনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি বেইজিং।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বৈঠকের উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এটি কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছে এবং সংলাপের অংশীদার হিসেবে চীনের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে।
চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। তার পরিবর্তে দেশটির একজন সামরিক অ্যাটাশে বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে অংশ নিতে বেইজিংয়ে অবস্থান করছিলেন ডং জুন।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো। চীনের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে বেইজিং। আসিয়ানের অন্য কোনো সদস্য দেশও এ বিষয়ে একই ধরনের উদ্বেগ জানায়নি।
সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে তেওদোরো বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে সামান্য কিছু সংযোজনের সুযোগও ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মতবিনিময়কে প্রাণবন্ত ও খোলামেলা রাখার সুযোগ দিয়েছি। আমার মনে হয়, এটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নিজেদের কথা বলার সুযোগ পাওয়া।’
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে অংশ নিতে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে আমন্ত্রণ জানিয়ে আগেই নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে ফিলিপাইন
বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে বারবার মুখোমুখি অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে তেওদোরোর ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় বেইজিং ও ম্যানিলার সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে।
আসিয়ানের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং অভিন্ন অবস্থান খুঁজে বের করার ওপর জোর দিয়েছিলেন অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা। তবে বৈঠকের শেষ দিনে চীন-ফিলিপাইন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েন আবারও আলোচনায় আসে।
এদিকে বৈঠককে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের পাশাপাশি মিত্র ও অংশীদারদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে ১১ সদস্যের আসিয়ান জোটের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি।
চীন তাদের মানচিত্রে তথাকথিত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দেখিয়ে প্রায় পুরো দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে। এ রেখা মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ব্রুনেই ও ইন্দোনেশিয়ার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কিছু অংশের ওপর দিয়ে গেছে।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত এক রায়ে জানায়, দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর চীনের বিস্তৃত দাবির আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই। তবে বেইজিং ওই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের দাবিদার কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ২০১৬ সালের রায়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন তেওদোরো। তার যুক্তি, ওই রায়ের ভিত্তিগত নীতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অংশ; এটি শুধু ফিলিপাইনের নিজস্ব বিষয় নয়।
জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমির সঙ্গে বৈঠকেও দুই দেশ বিতর্কিত জলসীমায় চীনের জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের পরিসর ও ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
নিজ দেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের নেটওয়ার্কের পক্ষেও অবস্থান তুলে ধরেন তেওদোরো। এ ধরনের সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করছে—এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, চীনের পক্ষ থেকে ফিলিপাইনের সামুদ্রিক এলাকায় ‘একতরফা ও অবৈধ দাবি’ করা হচ্ছে।
তেওদোরো বলেন, ‘ফিলিপাইন যে মাত্রার কর্মকাণ্ডের মুখোমুখি হচ্ছে, আসিয়ানের অন্য কোনো দেশও যদি একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতো, তাহলে আমি নিশ্চিত, তারাও নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলত।’
এ সময় আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি ফিলিপাইনের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স