তাহসিফের বান্ধবী দিশা ‘অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির’, শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ
গণমাধ্যম ডেক্স
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তদন্তে এখনো কাটেনি রহস্যের জট। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দিশা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি। এমনকি নীরবতাও পালন করেছেন। এ কারণে তাকে ‘অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির’ উল্লেখ করে ফের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তার আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
এদিন প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ড শেষে জেরিকা তাসনিম দিশাকে আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন আদালতকে জানান, প্রথম দফার রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দিশা মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এজন্য তদন্ত কর্মকর্তা দিশার সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে রিমান্ড মঞ্জুরের জোর দাবি জানানো হয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তার জামিন আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দিশার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন।
রিমান্ড আবেদনে সাত কারণ
তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, চার দিনের রিমান্ডে দিশাকে পেয়ে মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ঘটনার আগের দিন ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ সাউরির সঙ্গে উত্তরা এলাকার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ গিয়েছিলেন। একই দিন সন্ধ্যায় একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস খাওয়ার কথাও জানান তিনি।
এছাড়া তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল গ্যারেজে যাওয়া, নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে অবস্থান এবং বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলে ঘোরাফেরার বিষয়েও বক্তব্য দিয়েছেন দিশা।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, দিশা মামলার ঘটনা সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, এ মামলার সন্দিগ্ধ আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে মামলার ঘটনার সঙ্গে দিশার সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
দিশার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদনে সাতটি কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো-
১. ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রুআপ কমপ্লেক্সে সিপি ফাইভ স্টার নামের ফাস্টফুডের দোকানে নাশতা করার সময় কোনো আবেগপ্রবণ কথাবার্তা বা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
২. ঘটনার দিন তাহসিফ ও দিশার মধ্যে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে কোনো কথাকাটাকাটি বা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
৩. ঘটনার দিন কিংবা এর আগে তাদের দুজনের সম্পর্কের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন চলছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।
৪. মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করা।
৫. অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা।
৬. ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার করা।
৭. দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্য ক্রসচেক করা।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন দিশা
গত শনিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে জেরিকা তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে বুধবার তাকে আবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় আসা তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নামেন তাহসিফ। এরপর নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন তিনি।
দীপ ২৯ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
তিন দিনেও এ ঘটনায় মামলা না হওয়ায় দীপকে নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। এর মধ্যে ৩০ অক্টোবর রাতে তাকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা দায়ের করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে বুধবার দীপেরও আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
দীপের দেওয়া তথ্যে উদ্ধার হয় মোটরসাইকেল
তদন্তে জানা যায়, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেন দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনে যান পিবিআই কর্মকর্তারা।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দিশা ও দীপকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের বক্তব্যের অসংগতি যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্তের বাকি রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স