'আমি ছাড়া কেউ তাঁকে বলতে পারে না তিনি কী করবেন': যুক্তরাষ্টের প্রথম মুসলিম সিনেটরের স্ত্রী কে এই শক্তিময়ী নারী সারাহ জুকাকু
গণমাধ্যম ডেক্স
এমন একজন জীবনসঙ্গী নারী-পুরুষ সবার জীবনই পাল্টে দিতে পারে। যুক্তরাষ্টের প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল-সাইদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শক্তিময়ী স্ত্রী সারাহ জুকাকুও এখন লাইমলাইটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনায় এখন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল আল-সাইদ। তাঁর এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন তাঁর শক্তিময়ী স্ত্রী ও চিকিৎসক সারাহ জুকাকু।

এমন একজন জীবনসঙ্গী নারী-পুরুষ সবার জীবনই পাল্টে দিতে পারে। আবদুল আল-সাইদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শক্তিময়ী স্ত্রী সারাহ জুকাকুও এখন লাইমলাইটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় থেকে তাঁর সঙ্গে দুই সন্তানের পরিবার গড়েছেন এই চিকিৎসক।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ডেট্রয়েটে স্বামীর শেষ নির্বাচনী সমাবেশে আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। সারাহর ভাষায়, ‘আবদুল আমার ও মেয়েদের কাছে ঠিক সেই মানুষ, যাঁকে আপনারা জনসমক্ষে দেখেন। তিনি যেখানেই থাকুন, যার সঙ্গেই কথা বলুন, একই কথা বলেন। কারণ, তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা মন থেকেই বলেন এবং সত্যিই তা বিশ্বাস করেন। এ কারণেই তিনি অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে আলাদা।’
আরেক বক্তব্যে সারাহ বলেন, আবদুলকে কোনো করপোরেশন, বিলিয়নিয়ার কিংবা বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠী কী করতে হবে বা কী বলতে হবে, তা নির্দেশ দিতে পারে না। মজা করে তিনি যোগ করেন, ‘হয়তো কখনো কখনো আমি ছাড়া!’ স্বামীর প্রতি আবেগ প্রকাশ করে সারাহ তাঁকে বলেছেন, ‘আমার জীবনের ভালোবাসা'।
নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, আবদুল যেভাবে তাঁর ও তাঁদের পরিবারের পাশে থাকেন, নির্বাচিত হলে মিশিগানের মানুষের ও তাঁদের পরিবারের পাশেও ঠিক সেভাবেই থাকবেন। অর্থাৎ সারাহর বর্ণনায়, আবদুল একজন অকপট, বিশ্বাসে অবিচল ও পরিবারকে সময় দেওয়া মানুষ।

৪২ বছর বয়সী আবদুল ৩ নভেম্বর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন। ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর।
আবদুল ও সারাহ দুজনেরই জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিশিগানে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় তাঁদের পরিচয়। দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বন্ধুত্ব থেকে একসময় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সারাহ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সেই সময়ই তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন আবদুল। ২০০৬ সালের অক্টোবরে দ্য মিশিগান ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সারাহ সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘যখন সে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। বয়সও কম ছিল। সে আমাকে বলেছিল, 'আমরা এখনো বেড়ে উঠছি, এবার আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠতে পারব'।
কম বয়সে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবদুলও একই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি প্রতিশ্রুতি ও একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি একজন মেয়ের সঙ্গেই পরিচিত হব এবং তাকেই বিয়ে করব।’
২০০৬ সালের মে মাসে বিয়ে করেন তাঁরা। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় তাঁদের। রাজনীতিতে আসার অনেক আগে থেকেই সারাহ ছিলেন আবদুলের সঙ্গী। উচ্চশিক্ষা, জনস্বাস্থ্য খাতের কাজ এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ, প্রতিটি পর্যায়েই পাশে ছিলেন তিনি।

সারাহর সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আবদুল বলেছিলেন, ‘জীবনসঙ্গীর সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার সুযোগ অনেকেই পান না। সারাহ ও আমি এই সুযোগ পেয়েছি, এ জন্য আমরা আনন্দিত ও ভাগ্যবান। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’
সারাহ জুকাকু পেশায় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাগেলোস কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে ২০১৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান আরবার ক্যাম্পাসে মনোরোগবিদ্যায় রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে মিশিগানের অ্যান আরবারে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান হেলথেও নেতৃত্বের দায়িত্বে রয়েছেন।

ভারতীয় অভিবাসী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সারাহর শিকড় দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে। তাঁদের পরিবারের আদি নিবাস উত্তর কন্নড় জেলার উপকূলীয় শহর ভাটকাল, যা ম্যাঙ্গালুরু থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে। সারাহর বাবা চিকিৎসক ডা. তাইয়েব জুকাকু একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ।

তাঁর আদি বাড়ি ভাটকালে। দাদা জুকাকু শামসুদ্দিন ছিলেন পরিচিত আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক। তিনি একসময় মুখ্যমন্ত্রী বি ডি জাট্টির অধীনে সাবেক মহীশূর রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৬ সালে বিয়ের পর প্রথম সন্তান এমালির জন্ম হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে তার বয়স ছিল আট বছর। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জন্ম নেয় তাঁদের দ্বিতীয় মেয়ে সেরিন। দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁদের সংসার। বর্তমানে পরিবারটি মিশিগানের অ্যান আরবারে বসবাস করে।

রাজনীতির আলোচনায় আবদুল যতটা পরিচিত, সারাহ ও তাঁদের দুই মেয়ে সাধারণত ততটাই আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন। তবে ২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনের প্রচারণায় কয়েকবার প্রকাশ্যে এসেছেন সারাহ।

২ নভেম্বর ডেট্রয়েটে স্বামীর শেষ নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময়ই জানতাম, আবদুলের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। আমার ও মেয়েদের কাছে আবদুল ঠিক সেই মানুষ, যাঁকে আপনারা দেখেন। তিনি যেখানেই থাকুন, যার সঙ্গেই কথা বলুন, একই কথা বলেন। কারণ, তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা মন থেকেই বলেন এবং সেই বিশ্বাসের প্রতি সৎ থাকেন। এ কারণেই তিনি অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে আলাদা।’
স্বামীর রাজনৈতিক সততা বোঝাতে সারাহ আরও বলেন, ‘কোনো করপোরেশন, কোনো বিলিয়নিয়ার, কোনো বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠী তাঁকে কী করতে হবে বা কী বলতে হবে, তা বলে দিতে পারে না।’ এরপর হাস্যরসের ছলে যোগ করেন, ‘হয়তো কখনো কখনো আমি বলি!’

একই সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মিশিগানের মানুষ আবদুলের মতো একজন লড়াকু মানুষ পাওয়ার যোগ্য। তিনি যেভাবে আমার ও আমাদের পরিবারের পাশে থাকেন, ঠিক সেভাবেই আপনাদের ও আপনাদের পরিবারের পাশে থাকবেন।’
সারাহর মতে, আবদুল ঘরে ও জনসমক্ষে একই রকম মানুষ। তাঁর চরিত্রে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন, কোথায় কথা বলছেন, তার ওপর নির্ভর করে নিজের বক্তব্য বা আচরণ বদলান না। এ কারণেই তিনি একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিক।
আবদুল মিসরীয় বংশোদ্ভূত। অন্যদিকে সারাহর পারিবারিক শিকড় দক্ষিণ ভারতে। ফলে তাঁদের সংসারে মিসরীয় ঐতিহ্য ও দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির মিশেল রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সারাহর পারিবারিক সংস্কৃতির প্রতিও ভালো লাগা তৈরি হয়েছে আবদুলের।

এক সাক্ষাৎকারে মজা করে তিনি বলেছিলেন, ‘শুনুন, আমি ২০ বছর ধরে একটি দক্ষিণ ভারতীয় পরিবারে বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছি। এখন তো আমি পুরোপুরি এই পরিবারের অংশ হয়ে গেছি। বলতে পারেন, আমি হয়তো আরবের চেয়ে ভারতীয়ই বেশি হয়ে গেছি।’ আরেকবার নিজের পরিবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নারীদের দিয়ে ঘেরা।’ স্ত্রী সারাহ ও দুই মেয়েকে বোঝাতেই মজা করে এ কথা বলেছিলেন তিনি।
আবদুলের রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের সঙ্গে সারাহর ব্যক্তিগত জীবনও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের ফাঁকে শুরু হওয়া যে সম্পর্কের যাত্রা, দুই দশক পর তা পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে। স্বামীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সারাহ শুধু জীবনসঙ্গী নন, তাঁর কাছে সবচেয়ে কাছের মানুষ ও সমর্থকদের একজন।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস, বিবিসি, সিএনএন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
সূত্র: প্রথম আলো