|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

৩ হাজার বছর আগে সন্তানকে দেওয়া এক পুণ্যবান বাবার ৯ উপদেশ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:০০ এএম
৪৩৭ পঠিত
৩ হাজার বছর আগে সন্তানকে দেওয়া এক পুণ্যবান বাবার ৯ উপদেশ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১ হাজার বছর আগে লোকমান হাকিম আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনের ৩১ নম্বর রয়েছে তার নামে। তাকে আল্লাহ বিশেষ প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।

আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১ হাজার বছর আগে লোকমান হাকিম আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনের ৩১ নম্বর রয়েছে তার নামে। একজন প্রজ্ঞাবান বাবা হিসেবে তাঁর কিছু উপদেশ কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, যা মানুষের জীবনবোধকে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে।

লোকমান হাকিমকে বিশেষ প্রজ্ঞা দানের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১২)

সেই প্রজ্ঞার অন্যতম প্রকাশ ঘটেছে সন্তানকে দেওয়া তাঁর উপদেশগুলোতে। সুরা লোকমানের ১৩ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের কিছু মূলনীতি এসেছে, যা ব্যক্তি ও পরিবার উভয় জীবনেই গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথম উপদেশ

‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে শিরক কোরো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা অন্যায়।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৩)

তিনি সন্তানকে প্রথমেই ইবাদত কিংবা সামাজিক শিষ্টাচারের কথা বলেননি, বরং তার বিশ্বাসের ভিত্তি সুদৃঢ় করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, মানুষের চিন্তা ও জীবনদর্শনের মূল হলো বিশ্বাস।

সেই বুনিয়াদ সঠিক না হলে জীবনের অন্যান্য অর্জনও তাকে প্রকৃত সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

শর্ষের একটি ক্ষুদ্র দানা মানুষের চোখে তুচ্ছ মনে হতে পারে। আবার সেটি যদি কোনো পাথরের ভেতরে কিংবা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অজানা কোনো স্থানে থাকে, মানুষের পক্ষে তা খুঁজে বের করা অসম্ভব হতে পারে।

দ্বিতীয় উপদেশ

লোকমানের উপদেশের মধ্যেই আল্লাহ-তাআলা নিজে মা-বাবার অধিকারের কথা স্মরণ করিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৪)

গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কোরআন মানুষকে তার শিকড়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আজ যে সন্তান নিজের যোগ্যতা ও অবস্থান নিয়ে গর্ব করে, তার পেছনে মা-বাবার অসংখ্য ত্যাগ ও শ্রম রয়েছে। সেই অবদান ভুলে যাওয়া শুধু অকৃতজ্ঞতা নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী।

তৃতীয় উপদেশ

সন্তানকে আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান সম্পর্কে সচেতন করতে লোকমান হাকিম বলেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান! কোনো কাজ যদি শর্ষের দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের ভেতরে, অথবা আকাশমণ্ডলীতে কিংবা পৃথিবীর কোথাও, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৬)

শর্ষের একটি ক্ষুদ্র দানা মানুষের চোখে তুচ্ছ মনে হতে পারে। আবার সেটি যদি কোনো পাথরের ভেতরে কিংবা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অজানা কোনো স্থানে থাকে, মানুষের পক্ষে তা খুঁজে বের করা অসম্ভব হতে পারে।

কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। মানুষের প্রকাশ্য-গোপন সব কাজ, তার অন্তরের অভিপ্রায় এবং পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্রতম ঘটনাও তাঁর অজানা নয়।

চতুর্থ উপদেশ

লোকমান তাঁর সন্তানকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান! নামাজ প্রতিষ্ঠা করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

নামাজ বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্ক সুদৃঢ় করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এখানে ‘নামাজ পড়ো’ বলার পরিবর্তে ‘নামাজ প্রতিষ্ঠা করো’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ নামাজ এমনভাবে আদায় করতে হবে, যাতে তা জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

নামাজের প্রভাব ব্যক্তিগত ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫) অর্থাৎ নামাজের শিক্ষা ও স্মরণ যখন মানুষের চিন্তাচেতনায় প্রভাব ফেলে, তখন তা তাকে অন্যায় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।

পঞ্চম উপদেশ

নামাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশের পর লোকমান বলেন, ‘সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

ইসলাম মানুষকে শুধু নিজের ভালো থাকা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শেখায় না, বরং সমাজের কল্যাণের প্রতিও দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই সামর্থ্য ও উপযুক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

ষষ্ঠ উপদেশ

এরপর লোকমান স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমার ওপর যে বিপদ আসে, তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)

সত্যের পক্ষে থাকা সব সময় সহজ হয় না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে, মানুষের কল্যাণে কাজ করেও কটুকথা শুনতে হতে পারে, এমনকি নিজের ন্যায্য অবস্থান ধরে রাখার কারণে ব্যক্তিগত অসুবিধাও দেখা দিতে পারে।

এসব পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধরে সঠিক পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন লোকমান।

সপ্তম উপদেশ

লোকমান তাঁর সন্তানকে অহংকার বর্জনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার মুখ ফিরিয়ে রেখো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)

মানুষের অর্থসম্পদ, জ্ঞান, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচিতি বাড়লে কখনো কখনো তার মধ্যে অন্যকে তুচ্ছ ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়। লোকমান শুধু অন্তরের অহংকার বর্জনের কথা বলেননি, মানুষের সঙ্গে আচরণেও যেন তার প্রকাশ না ঘটে, সে নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসুল (সা.) অহংকারের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, দামি পোশাক পরা কিংবা সুন্দর জীবনযাপন করাই অহংকারের মূল পরিচয় নয়। বরং সত্য সামনে আসার পরও তা গ্রহণ না করা এবং অন্য মানুষকে হেয় মনে করার নামই অহংকার।

অষ্টম উপদেশ

লোকমান বলেন, ‘তোমার চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৯)

এখানে চলাফেরার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনভাবে চলা উচিত নয়, যাতে আত্মপ্রদর্শন প্রকাশ পায়। আবার স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় চলাফেরায় অকারণ শিথিলতা বা কৃত্রিমতাও কাম্য নয়।

এই নির্দেশ মানুষের সামগ্রিক জীবনাচরণেও মিতাচারের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যয়, সামাজিক অবস্থান প্রকাশ এবং দৈনন্দিন আচরণে সামঞ্জস্য রাখা একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বৈশিষ্ট্য।

মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম তার কথাবার্তা। মানুষ কীভাবে কথা বলে, মতবিরোধের সময় কেমন আচরণ করে, এসবের মাধ্যমে তার শিষ্টাচারের পরিচয় পাওয়া যায়।

নবম উপদেশ

উপদেশের শেষাংশে লোকমান হাকিম কণ্ঠস্বর সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রাখো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৯)

মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম তার কথাবার্তা। মানুষ কীভাবে কথা বলে, মতবিরোধের সময় কেমন আচরণ করে, এসবের মাধ্যমে তার শিষ্টাচারের পরিচয় পাওয়া যায়।

কণ্ঠস্বর উঁচু করলেই যে বক্তব্যের গুরুত্ব বেড়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। তবে এ আয়াতের অর্থ এটাও নয় যে, সব পরিস্থিতিতেই নিচু স্বরে কথা বলতে হবে। নিষেধ করা হয়েছে অযথা উচ্চকণ্ঠ ও অসংযত আচরণকে।

লোকমান হাকিমের প্রজ্ঞাময় উপদেশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় বিশ্বাস ও চিন্তার সংশোধন থেকে; এরপর সেই পরিবর্তন প্রকাশ পায় ইবাদত, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য ও আচরণের সৌন্দর্যে।

  • নাহিদা সুলতানা : আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    nahidasultana753375@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো