|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

এনএপিডির মহাপরিচালক নিয়ম মানেন না, বেশির ক্লাস নেন নিজে, ভাতার ভাগও দেন না

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম
২৮০ পঠিত
এনএপিডির মহাপরিচালক নিয়ম মানেন না, বেশির ক্লাস নেন নিজে, ভাতার ভাগও দেন না
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এনএপিডির মহাপরিচালক তিনটি প্রশিক্ষণ কোর্সে নিয়েছেন ৬২টি। ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম থেকে সম্মানী গ্রহণ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

দুই মাসের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে সেই নিয়ম মানছেন না জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির (এনএপিডি) মহাপরিচালক খায়রুল কবীর মেনন।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে নির্ধারিত সীমার তিন গুণ ক্লাস নিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দুটি কোর্সেও নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ ক্লাস নিয়েছেন।

এনএপিডির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশিক্ষণ কোর্সে বাইরের রিসোর্স পারসনদের বেশি ক্লাস দেওয়ার রীতি রয়েছে। কিন্তু মহাপরিচালক নিজেই বেশি ক্লাস নেওয়ায় বাইরের রিসোর্স পারসনদের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকায় প্রকাশ্যে কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানাতে পারছেন না। তাঁদের মতে, বিষয়টি শুধু আর্থিক নয়, নিয়ম ও নৈতিকতারও। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তাঁরই নিয়ম মেনে চলার কথা। অথচ তিনি নিজেই নিয়মের বাইরে গিয়ে বেশি ক্লাস নিচ্ছেন। আগের মহাপরিচালকদের কেউ এত বেশি ক্লাস নিতেন না।

জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এর মূল কাজ। ১৯৮০ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে ঢাকার নীলক্ষেতে নিজস্ব ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে একাডেমি। পরের বছর এটিকে ইনস্টিটিউট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৯৬ সালে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির বোর্ড অব গভর্নরসের পঞ্চম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, একাডেমির কোনো সদস্য বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ১০টির বেশি ক্লাস নিতে পারবেন না। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া সম্মানীর ২০ শতাংশ হিসাব শাখায় জমা দিতে হবে। এই অর্থ একাডেমির নিজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং তা দিয়ে একাডেমির পেনশন দেওয়া হবে। বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যান পরিকল্পনামন্ত্রী এবং ভাইস চেয়ারম্যান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

গত ৯ জুলাই এনএপিডির ফ্যাকাল্টিদের পদক্রম অনুযায়ী সেশনসংখ্যা নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির সভায় সুপারিশ করা হয়, সচিব বা প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ১০টি সেশন পরিচালনা করতে পারবেন। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্রশিক্ষণে সেশন বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ভারসাম্য ও পদমর্যাদাভিত্তিক যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া একাডেমির নিজস্ব ফ্যাকাল্টি ও বাইরের রিসোর্স পারসনদের মধ্যে সেশন বণ্টনে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়।

অর্থাৎ বোর্ড অব গভর্নরসের পুরোনো সিদ্ধান্ত এবং একাডেমির নিজস্ব কমিটির সুপারিশ—দুই ক্ষেত্রেই একজন সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মহাপরিচালক নিজেই এসব নির্দেশনা মানছেন না।

এনএপিডির মহাপরিচালক খায়রুল কবীর মেনন

নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক নয়

জানতে চাইলে এনএপিডির মহাপরিচালক খায়রুল কবীর মেনন প্রথম আলোকে বলেন, মহাপরিচালক সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস নেবেন, এটা মানা বাধ্যতামূলক নয়। বিগত সময়ে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। অন্য মহাপরিচালকেরা এর চেয়ে বেশি ক্লাস নিয়েছেন।

ক্লাস থেকে আয়ের ২০ শতাংশ অর্থ হিসাব শাখায় জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি কেন করেন না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা এনএপিডিতে প্রেষণে আসি, এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল নই। আমাদের বদলির আদেশ হলে চলে যাব। এ টাকা আমরা ফেরত পাব না। এ পেনশন থেকে আমরা সুফল পাব না। তাহলে অর্জিত আয়ের ২০ শতাংশ টাকা কেন আমরা সেখানে দেব। মহাপরিচালক বলেন, একটি ক্লাস নেওয়ার আগে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়, প্রস্তুতি নিতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়। সেখান থেকে সম্মানী নিলে সমস্যা কোথায়। বোর্ড অব গভর্ন্যান্সের পরবর্তী সভায় এসব নিয়ম সংশোধনের প্রস্তাব তুলবেন বলে জানান এনএপিডির মহাপরিচালক।

তবে এনএপিডির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত সময়ে যাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরা এত বেশি ক্লাস নিতেন না। কেউ কেউ ক্লাসই নিতেন না। তাঁরা জোর দিতেন প্রতিষ্ঠানের নীতি–কৌশল উন্নয়নের দিকে। প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের দিকে।

মহাপরিচালকের যত ক্লাস

খায়রুল কবীর মেনন গত ১৭ জুন এনএপিডির মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর যোগদানের পর ১২ জুলাই নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৩৫তম বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হয়। কোর্সটি শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর। প্রায় দুই মাসের এই কোর্সে তিনি ৩০টি ক্লাস নেন। প্রতিটি ক্লাসের জন্য সম্মানী ছিল ৩ হাজার ৬০০ টাকা।

এ ছাড়া কোর্সে দুটি এক্সটেনশন লেকচার বা সম্প্রসারণ বক্তৃতার জন্য প্রতিটিতে ৫ হাজার টাকা করে এবং দুটি সাক্ষাৎকারের জন্য প্রতিটিতে ৬ হাজার টাকা করে সম্মানী নেন খায়রুল কবীর মেনন।

ঢাকার বাইরে শিক্ষাসফরে অংশগ্রহণ, বই পর্যালোচনা সভা, উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েও সম্মানী নেন মহাপরিচালক। ফলে একটি কোর্স থেকে তাঁর মোট আয়ের পরিমাণ কত, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

৩৫তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মহাপরিচালক একের পর এক ক্লাস নিচ্ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি আপত্তিও তুলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, দুই মাসের একটি কোর্সে বেশির ভাগ ক্লাস একজন নিলে তা দৃষ্টিকটু লাগে। শুধু তাঁর মতামতই শোনা যায়, ভিন্ন কোনো মতামত শোনা যায় না। এতে প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের সমৃদ্ধ করার সুযোগ কমে যায়।

এনএপিডি সূত্রে জানা যায়, একই সময়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তাদের ১৩৮তম ও ১৩৯তম বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ আগস্ট শুরু হয়ে কোর্স দুটি শেষ হয় ১৪ অক্টোবর। প্রতিটি কোর্সে মহাপরিচালক ১৬টি করে ক্লাস নেন।

এ ছাড়া দুটি কোর্সেই বই পর্যালোচনা সভা, প্রতিবেদন উপস্থাপনা, সম্প্রসারণ বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার, শিক্ষাসফর, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন তিনি। শিক্ষাসফরে অংশগ্রহণ এবং সফর-পরবর্তী প্রতিবেদন উপস্থাপনেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। এসব কার্যক্রমের জন্যও সম্মানীর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে চার মাসের দায়িত্বকালে তিনটি প্রশিক্ষণ কোর্সে ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম থেকে মহাপরিচালক মোট কত টাকা সম্মানী পেয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।

নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী, তিনটি কোর্সে মহাপরিচালকের সর্বোচ্চ ৩০টি ক্লাস নেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি নিয়েছেন ৬২টি। এর বাইরে অন্যান্য সেশন ও কার্যক্রম মিলিয়ে তাঁর ক্লাস ও অংশগ্রহণের সংখ্যা অন্তত ৭৫। এ সময় সন্ধ্যাকালীন বিভিন্ন ছোট কোর্সেও সীমিত পরিসরে ক্লাস নিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্য ক্যাডারের প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া চারজন নবীন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মহাপরিচালক তুলনামূলক বেশি ক্লাস নিতেন। তবে ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তা তাঁরা জানতেন না।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মহাপরিচালক দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি কর্মকর্তাদের শিষ্টাচার ও আদব–কায়দা, নেতৃত্ব, সুশাসন, তথ্য অধিকার আইন এবং সরকারি কর্মচারী আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ক্লাস নিয়েছেন।

সূত্র: প্রথম আলো