|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

নিউজিল্যান্ডের উপকূলে ৪৫টি পাইলট তিমি আটকে পড়ল কেন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
২৭৭ পঠিত
নিউজিল্যান্ডের উপকূলে ৪৫টি পাইলট তিমি আটকে পড়ল কেন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
উপকূলের পরিবেশ উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছিল। নিউজিল্যান্ডের নর্থ দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল কুক প্রণালির প্রবল ঢেউয়ের মুখে পড়ে। এখানকার সৈকতে রয়েছে আলগা নুড়ি ও ধারালো পাথর।

নিউজিল্যান্ডের একটি সৈকতে একসঙ্গে উঠে এসেছে ৪৫টি পাইলট তিমি। ৫ নভেম্বর ২০২৬ বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। দেশটির নর্থ দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের কেপ প্যালিসার এলাকার নাগাওয়াই উপকূলে দেখা যায় তিমিগুলোকে। খবর পেয়ে উদ্ধারকর্মীরা ছুটে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটিকেও বাঁচানো যায়নি। তিমিগুলোর একসঙ্গে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসার ঘটনাকে উদ্ধারকর্মীরা ‘কঠিন ও মর্মান্তিক’ বলে।

নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ বিভাগ (ডিওসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল আটটার কিছু পরে উপকূলে তিমিগুলোকে দেখা যায়। সেদিন সকালে অন্তত ২০টি তিমিকে সৈকতে আটকে পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে চারটি তখনো জীবিত ছিল। পরে পরিবেশবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রজেক্ট জোনাহ নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে, তারা ডিওসি এবং স্থানীয় মাওরি আদিবাসীদের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে তিমিগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জোয়ারের সময় জীবিত তিমিগুলোকে আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা সফল হয়নি। শুক্রবার বিকেলে ডিওসি জানায়, নাগাওয়াই থেকে মাঙ্গাতোতো উপকূল পর্যন্ত মোট ৪৩টি তিমিকে আটকে পড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কোনো তিমিই বেঁচে নেই।

কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তিমিগুলোর অনেককেই উদ্ধারের আগেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। জীবিতগুলোও দিনের বিভিন্ন সময়ে মারা যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুরুতেই স্থানীয় বাসিন্দারা জীবিত তিমিগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যতটা সম্ভব সেগুলোকে ঠান্ডা ও স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা।

তিমিগুলোর মৃত্যুর পর সেগুলো সমাহিত করার ব্যবস্থা করছে ডিওসি। এ কাজে স্থানীয় মাওরি জনগোষ্ঠীর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

উপকূলের পরিবেশ উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছিল। নিউজিল্যান্ডের নর্থ দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল কুক প্রণালির প্রবল ঢেউয়ের মুখে পড়ে। এখানকার সৈকতে রয়েছে আলগা নুড়ি ও ধারালো পাথর। সব মিলিয়ে তিমিগুলোর কাছে পৌঁছানো এবং সেগুলোকে উদ্ধার করা বেশ কঠিন ছিল। তার ওপর ঘটনাস্থলটি দুর্গম এলাকায়।

কেন একসঙ্গে সৈকতে উঠে আসে তিমি

স্থানীয় জেলে অ্যান্ড্রু সিমের কাছে ঘটনাটি ছিল খুবই দুঃখজনক। বৃহস্পতিবার সিএনএনের সহযোগী সংবাদমাধ্যম আরএনজেডকে তিনি বলেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে এই উপকূলে কাজ করছেন তিনি। এর মধ্যে আগেও তিমিদের সৈকতে আটকে পড়তে দেখেছেন। কিন্তু পাইলট তিমিদের এভাবে উপকূলে উঠে আসতে কখনো দেখেননি।

সিম বলেন, ‘তারা এখানে কেন চলে এল, সেটাই খুব অদ্ভুত। সত্যি বলতে, এর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। হয়তো নিছকই দুর্ভাগ্য।’

পাইলট তিমিদের দলবদ্ধভাবে সৈকতে আটকে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যেসব তিমি সবচেয়ে বেশি গণহারে সৈকতে আটকে পড়ে, পাইলট তিমি তাদের অন্যতম। তবে কেন এমন ঘটনা ঘটে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণবিষয়ক বিভাগের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ইয়ান এল বয়েড বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের মাধ্যমে সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সাধারণত যেসব প্রাণী অত্যন্ত সামাজিক, তাদের মধ্যেই এ ধরনের গণ-আটকে পড়ার ঘটনা বেশি দেখা যায়। সম্ভবত একটি সামাজিক দলের সব সদস্য কিংবা দলের একটি অংশ একই সময়ে সৈকতে আটকে পড়ে।

বয়েডের মতে, বিশেষ কিছু উপকূলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। বিশেষ করে যেসব উপকূল ধীরে ধীরে অগভীর হয়ে এসেছে, সেখানে এমনটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর ধারণা, কোনো একটি দলের সব সদস্য পথ হারিয়ে ফেলতে পারে। এরপর ভাটা নামতে শুরু করলে এরা অগভীর পানিতে আটকে যায়। তবে এটিই পুরো ঘটনার একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে আরও জটিল কিছু বিষয় কাজ করতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ বিভাগের ব্যাখ্যাতেও পাইলট তিমিদের সামাজিক আচরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। এই তিমিরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। দলের কোনো একটি তিমি পথ হারিয়ে ফেললে অন্যরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ফলে একটি তিমি বিপদে পড়লে পুরো দলই একই সঙ্গে উপকূলে চলে আসতে পারে।

গণহারে তিমিদের সৈকতে আটকে পড়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, অগভীর ও ঢালু পানিতে পাইলট তিমিদের প্রতিধ্বনি শনাক্ত করার ক্ষমতা বা ইকোলোকেশন ঠিকভাবে কাজ করে না। ইকোলোকেশন হলো এমন এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রাণীরা শব্দ তৈরি করে এবং সেই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায়। পাইলট তিমিরা এই পদ্ধতির সাহায্যে পানির নিচে চলাচল করে। কিন্তু অগভীর ও ঢালু উপকূলে এই পদ্ধতি এদের জন্য যথেষ্ট কার্যকর না-ও হতে পারে। ফলে এরা দিক হারিয়ে সৈকতের দিকে চলে আসতে পারে।

কোন সময়ে বেশি ঘটে এমন ঘটনা

নিউজিল্যান্ডে এখন গ্রীষ্মকাল। এ সময় পাইলট তিমিরা খাবারের সন্ধানে উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। আর দেশটিতে গণহারে তিমিদের সৈকতে আটকে পড়ার ঘটনাও সবচেয়ে বেশি ঘটে এ সময়েই।

নিউজিল্যান্ডে পাইলট তিমিদের সবচেয়ে বড় গণ-আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৮ সালে। তখন দেশটির চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জে আনুমানিক এক হাজার পাইলট তিমি সৈকতে আটকে পড়েছিল বলে জানা যায়।

ওশেনিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের প্রত্যন্ত কয়েকটি দ্বীপের কাছে হাঙরে ভরা পানিতে প্রায় ৫০০ পাইলট তিমি মারা যায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া উপকূলে ১৫০টির বেশি তিমি সৈকতে আটকে পড়েছিল। গত ৫০ বছরের মধ্যে তাসমানিয়ায় এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম ঘটনা। শেষ পর্যন্ত সব কটি তিমিই মারা যায় অথবা তাদের যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে মেরে ফেলা হয়। এর আগের বছর পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে প্রায় ১৬০টি পাইলট তিমি আটকে পড়েছিল। এর মধ্যে ২৮টি মারা যায়। বাকিদের বেশির ভাগকেই আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

সূত্র: প্রথম আলো