ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন নেতানিয়াহু ও মোসাদপ্রধান
গণমাধ্যম ডেক্স
ইসরায়েলে গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের ঠিক আগে ইরানের বড় ধরনের হামলা চালাতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর অনুগত মোসাদপ্রধান রোমান গফম্যান। গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েলভের এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কোনো সূত্রের পরিচয় দেওয়া হয়নি। এতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ওই হামলার পক্ষে ছিলেন না। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এতে সংঘাত ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে, এমনকি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব না–ও হতে পারে।
এরপরও অভিযানের প্রস্তুতি এগিয়ে চলেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থার এক সদস্যের ভুলে যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনাটি জেনে যায়। ওয়াশিংটন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নেতানিয়াহুর এ হামলার উদ্যোগ আটকে দেয়। কী ধরনের হামলার পরিকল্পনা ছিল, তা জানায়নি চ্যানেল টুয়েলভ। তবে চ্যানেলটি বলেছে, সামরিক বিধিনিষেধ মেনে প্রতিবেদনটি প্রচার করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর দপ্তর প্রতিবেদনটি নাকচ করে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তখনই স্পষ্ট করেছিলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছে চ্যানেল টুয়েলভ। নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচক বারাক বলেন, সেনাপ্রধানকে না জানিয়ে মোসাদের মাধ্যমে ইরানকে ঘিরে একটি ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন নেতানিয়াহু।
শুক্রবারের এই প্রতিবেদনের আগেও একই ধরনের কয়েকটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ইসরায়েলের নির্বাচনের ঠিক আগে সেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল।
ভোটের দুই দিন আগে ২৫ অক্টোবর চ্যানেল টুয়েলভ জানায়, নেতানিয়াহু ও সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরের মধ্যে ‘নজিরবিহীন বিরোধ’ চলছিল। বিরোধের কারণ ছিল প্রধানমন্ত্রীর একটি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ওই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বাধাতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে চ্যানেলটি জানায়, জামির ওই সামরিক পদক্ষেপ নিতে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি পদক্ষেপটির আইনগত অনুমোদনসংক্রান্ত নথিতে নেতানিয়াহুর স্বাক্ষরও চেয়েছিলেন। কী পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
চ্যানেলটি তখন জানিয়েছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ওই প্রতিবেদনও সামরিক বিধিনিষেধ মেনে প্রচার করা হয়েছিল।
এক সামরিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এমন এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা এই সংবেদনশীল সময়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। এতে পরিস্থিতি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করারও আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে চ্যানেল টুয়েলভের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তাঁদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের সুবিধার জন্য ইরান ইস্যুকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
২৫ অক্টোবর রাতে চ্যানেল ফোরটিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রতিবেদন নিয়ে নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি একে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দেন। বলেন, জামিরের সঙ্গে তাঁর ‘কোনো বিরোধ নেই’।
একই সাক্ষাৎকারের শুরুর দিকে নেতানিয়াহু বলেন, সম্প্রতি তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও মোসাদকে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে চ্যানেল টুয়েলভের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট নির্দেশটির সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়নি।
চ্যানেল টুয়েলভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পালমাহিম বিমানঘাঁটিতে এক বৈঠকেও নেতানিয়াহু ও জামিরের মধ্যে বিরোধ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। বৈঠকের পরিবেশ ছিল ‘অত্যন্ত তিক্ত’।
চ্যানেল টুয়েলভ এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলেছেন, ‘গত কয়েক দিনে জামির যে ভূমিকা রেখেছেন, ইতিহাস তা ভুলবে না’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

নির্বাচনের এক দিন আগে ২৬ অক্টোবর চ্যানেল টুয়েলভ ও থার্টিন আরও একটি খবর প্রচার করে। এতে বলা হয়, নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ (ইরানের বিরুদ্ধে) সামরিক পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। সেনাপ্রধান জামির একাই সেটার বিরোধিতা করেন। অন্য কোনো নিরাপত্তাপ্রধান তাতে আপত্তি জানাননি। সামরিক বাহিনীর আশঙ্কা ছিল, ওই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাধাতে পারে। নির্বাচনও ভেস্তে যেতে পারে।
একই দিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করছিলেন নেতানিয়াহু। তবে জামিরের বাধায় তা এগোয়নি।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, এর কয়েক দিন আগে জামিরের মনে আরেকটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আলাদা কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছেন, যা সরাসরি প্রকাশ্য হামলার পর্যায়ে পড়বে না। জামিরের ধারণা ছিল, এমন পদক্ষেপ ভুল হবে। এতে ইসরায়েলে হামলা চালাতে ইরান উসকানি পেতে পারে।
শুক্রবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট হারজগ জানান, ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানিয়েছে ৪৬ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো।
সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন প্রেসিডেন্ট
ইসরায়েলে ফলাফল স্পষ্ট হলেও সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার আগে দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আরও আলোচনা করবেন বলে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। আজ রোববার গঠনের জন্য যেকোনো একটি পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি।
আইজেনকটের দল ইয়াশার দ্রুত তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দলটির ভাষ্য, ২০১৫ সালের পর কোনো প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী এত বেশি আইনপ্রণেতার সমর্থন পাননি।
ইসরায়েলি আরব দল ও জোটের সমর্থন পাওয়ার পর আইজেনকটের প্রতি এখন নবনির্বাচিত ৬৭ আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, তিনি রোববারের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।
‘আমরা ইরানের সঙ্গে কথা বলছি’
ভেস্তে যাওয়া হামলা নিয়ে প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে চ্যানেল টুয়েলভে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অগ্রগতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন বলে খবর রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে চ্যানেল টুয়েলভ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পকে একটি অনুরোধ করেছিলেন নেতানিয়াহু। ভোট শেষ হওয়ার পরপরই যেন ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করা হয়। ওই নির্বাচনে দেশজুড়ে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি।
তবে চ্যানেলটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় আরও সময় দিতে চান ট্রাম্প।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, আলোচনার ফলে ইরানের ওপর চাপ অনেকটা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প চান, এই কূটনৈতিক চেষ্টায় ইসরায়েল যেন হস্তক্ষেপ করা থেকে আপাতত বিরত থাকে।
গতকাল হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, ইরানের প্রতি তাঁর বার্তা কী। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানকে পরাজিত করেছি। ইরানে আমরা খুব ভালো করছি। আমরা ইরানের সঙ্গে কথা বলছি। ছয় বা সাত মাসে আমরা একজন সেনাও হারাইনি।’
ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে থামাতে না পারলে আজ ইসরায়েল, এমনকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যেরই অস্তিত্ব থাকত না।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কেউ এটা বলতে চায় না; কিন্তু সবাই জানে, এটাই সত্য।’
সূত্র: প্রথম আলো