উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি
গণমাধ্যম ডেক্স
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আকিজ রিসোর্সের নতুন ব্র্যান্ড ‘ইনোভার’। যাত্রা শুরুর মাত্র এক বছরের মধ্যেই ইলেকট্রিক্যাল, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, পাম্প ও টুলস ক্যাটাগরির পণ্য দিয়ে বাজারে নিজেদের ভালো অবস্থান নিশ্চিত করেছে ব্র্যান্ডটি। ইনোভারের এক বছরের পথচলা, বর্তমান সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন আকিজ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসুদ আল আমিন রাজিব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ।
প্রথম আলো: ইনোভারের এক বছরের পথচলা কেমন ছিল এবং বর্তমান অবস্থান কেমন?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: ইনোভারের জন্য গত এক বছর ছিল সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের মতো বেশ প্রতিযোগিতামূলক খাতে নতুন ব্র্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা গ্রাহক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও পরিবেশকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। বিশেষ করে পণ্য–সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশিত সাড়া এবং পণ্যের ক্রমবর্ধমান বিক্রি সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। শুরুতে বৈদ্যুতিক পণ্য নিয়ে যাত্রা করলেও বর্তমানে আমরা হোম অ্যাপ্লায়েন্স, পাম্প, টুলসসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পণ্যের পরিসর অনেক সম্প্রসারণ করেছি।
প্রথম আলো: দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও শিল্পায়নে হালকা প্রকৌশল খাত কতটা সম্ভাবনাময় বলে আপনি মনে করেন?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: দেশে হালকা প্রকৌশল খাতের বার্ষিক বাজার প্রায় ৮২০ কোটি মার্কিন ডলারের। আর শুধু ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের বাজারেই প্রতি মাসে ৫০০ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়। অন্যদিকে হালকা প্রকৌশল খাতের বৈশ্বিক বাজার প্রায় আট লাখ কোটি মার্কিন ডলারের। বিশাল এই বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারি এখনো খুবই সামান্য। ফলে দেশীয় বাজারে প্রবৃদ্ধির যেমন বিপুল সুযোগ রয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক বাজারেও বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ানোর অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রথম আলো: আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে আকিজ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: দেশে হালকা প্রকৌশল খাতের বার্ষিক যে বাজার, তার প্রায় অর্ধেকই সরবরাহ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে এই খাতে এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়ে গেছে। এমন বিষয় বিবেচনায় রেখেই কাজ করছে আকিজ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। আমরা খুব শিগগিরই মেটাল পার্টস তৈরির নিজস্ব প্ল্যান্ট স্থাপন করতে যাচ্ছি। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করবে। আগামী দিনগুলোয় আমাদের পণ্যের বৈচিত্র্য যেমন বাড়বে, তেমনি সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে পারব।
প্রথম আলো: বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, অটোমেশন ও নতুন পণ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আপনারা কতটা জোর দিচ্ছেন?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের কারখানায় সার্কিট ব্রেকার তৈরি এবং কোয়ালিটি টেস্টিংয়ের জন্য রোবোটিক আর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। কারখানায় ব্যবহৃত প্রতিটি মেশিনই সপ্তম প্রজন্মের প্রযুক্তিসম্পন্ন। এ ছাড়া বাংলাদেশের লো–ভোল্টেজ ইলেকট্রিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে আমরাই প্রথম সিএফএস (সেন্ট্রাল ফিডিং সিস্টেম) প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অপচয় কমছে, মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হ্রাস পাচ্ছে এবং উৎপাদনে নির্ভুলতার পাশাপাশি পণ্যের সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিত করা সহজ হচ্ছে।
প্রথম আলো: কাঁচামাল, নীতিসহায়তাসহ এই শিল্পের বিকাশে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী এবং তা উত্তরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস শিল্পের অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই শিল্পকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে সরকারের নীতিগত সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর কমানো, কাঁচামাল ও আধুনিক মেশিন আমদানিতে শুল্কের সুবিধা প্রদান, সহজ আমদানির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথম আলো: আকিজ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আপনারা কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে কতটা ভূমিকা রাখছেন?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: আমাদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের পরিবারসহ অন্তত ছয় হাজারের বেশি মানুষের জীবন–জীবিকার সঙ্গে আমরা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এসব পরিবারের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে আকিজ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের মূল লক্ষ্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উন্নয়ন।
প্রথম আলো: নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইনোভার কতটুকু পণ্য বৈচিত্র্যকরণ করছে? দেশের বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: আমাদের ট্যাগলাইন হলো ‘ডিজাইনড ফর নাউ’। এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখেই আমরা বর্তমান সময়ের গ্রাহকদের পরিবর্তনশীল রুচি, চাহিদা ও জীবনযাত্রাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। গ্রাহকদের প্রত্যাশা বিবেচনায় রেখে পণ্যের ডিজাইন, প্রযুক্তি ও ফিচার উন্নয়নে নিরলস কাজ চলছে।
প্রথম আলো: আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
মাসুদ আল আমিন রাজিব: আমাদের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা হলো, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ইনোভার ব্র্যান্ড বাজারের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান নিশ্চিত করবে। কারখানা আরও অত্যাধুনিক করতে চাই। দেশে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি জিডিপিতে আমাদের অবদান আরও বৃদ্ধি করাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রথম আলো: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মাসুদ আল আমিন রাজিব: প্রথম আলো এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।
সূত্র: প্রথম আলো