|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ওলীপুরীর দেওয়া চিঠি নিয়ে মুখ খুললেন বাখেম আমিরের ৩ মুরুব্বি

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১১ পিএম
২৮৬ পঠিত
ওলীপুরীর দেওয়া চিঠি নিয়ে মুখ খুললেন বাখেম আমিরের ৩ মুরুব্বি
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বাখেম) আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে কওমি অঙ্গনে মওদুদী ও সালাফি মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আকিদা ও কওমি ঐতিহ্যের সুরক্ষায় মামুনুল হকের ‘তিন মুরুব্বি’ বা উপদেষ্টার কাছে...

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বাখেম) আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে কওমি অঙ্গনে মওদুদী ও সালাফি মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আকিদা ও কওমি ঐতিহ্যের সুরক্ষায় মামুনুল হকের ‘তিন মুরুব্বি’ বা উপদেষ্টার কাছে ৬ পৃষ্ঠার একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক ও খ্যাতিমান আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করা নিয়ে আলেমদের মধ্যকার মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসার পর এই চিঠির বিষয়বস্তু কওমি অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

এই অবস্থায় চিঠির বিষয়ে অবস্থান জানতে মাওলানা মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ওলীপুরীর পাঠানো চিঠি পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন তারা।

চিঠি থেকে প্রাপ্ত্য তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে দেওয়া এক বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক উল্লেখ করেছিলেন, তার কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে কারো আপত্তি থাকলে তা যেন তার তিন মুরুব্বির কাছে পেশ করা হয় এবং তাদের ফয়সালা তিনি মেনে চলবেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানীর মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে চিঠিটি পাঠান ওলীপুরী।

সম্প্রতি সিলেটে আয়োজিত খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আলেমদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আলেমদের একাংশের বক্তব্য, আকিদাগত অবস্থান পরিষ্কার না করে কওমি সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। এই উত্তাপের ধারাবাহিকতায় ওলীপুরীর চিঠিটি প্রকাশ্যে আসে।

চিঠির বিষয়ে কথা বললে মাওলানা লিয়াকত আলী জানান, চিঠিটি যখন এসে পৌঁছায়, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কিছু ব্যস্ততাও ছিল। বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘চিঠিটি তো মূলত তিনজনকে দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা চেয়েছিলাম তিনজন একসাথে বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব। এখন আমরা তিনজন বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে, মাওলানা মাহফুজুল হক বিষয়টিকে কেবল লিখিত জবাবের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেয়ে সরাসরি আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, চিঠিতে যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তা কেবল লিখিত জবাব দেওয়ার মতো বিষয় নয়; বরং মুখোমুখি আলোচনার বিষয়।

তার বক্তব্য, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি, তবে চিঠির বিষয়গুলো এমন যে, এটা লিখিত জবাব দেওয়ার মতো কিছু না। এটা হলো সাক্ষাতে কথা বলার মতো বিষয়। ওলীপুরি সাহেব তো ওইরকমভাবে সাক্ষাতে কথা বলার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি। আমরা মনে করি এখানে মাওলানা মামুনুল হকসহ সবাই বসে কথা বলা দরকার। তো কোনো সময় সরাসরি সাক্ষাতে বসার উদ্যোগ নিলে ইনশাআল্লাহ আমরা কথা বলব।’

আরেক মুরুব্বি অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীও চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে তিনি বাইরে অবস্থান করায় পরবর্তীতে বিস্তারিত মতামত জানাবেন বলে উল্লেখ করেন। ফোনালাপে কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘চিঠি এসেছে। তবে এখন আমি একটু বাইরে আছি। চিঠিটি সামনে নিয়ে আপনাকে পরে বিস্তারিত জানাব ইনশাআল্লাহ।’

চিঠিতে ওলীপুরীর মূল আপত্তি ও উত্থাপিত প্রশ্ন উপদেষ্টাদের কাছে পাঠানো ছয় পৃষ্ঠার দীর্ঘ চিঠিতে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী কওমি আকিদা ও দেওবন্দী আদর্শ রক্ষায় বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন।

চিঠিতে উত্থাপিত প্রধান বিষয়গুলো

১. আকিদাগত তুলনা ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা: মাওলানা মামুনুল হকের এক বক্তব্যে চার মাজহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) সাথে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে দাবি করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেন ওলীপুরী। তিনি উল্লেখ করেন, মাজহাব চতুষ্টয়ের আকিদার সাথে সালাফি ও মওদুদীবাদীদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম হিসেবে এমন মন্তব্য সাধারণ আলেম ও ছাত্রদের মওদুদীবাদ ও সালাফিবাদের দিকে ধাবিত করবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

২. ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কা বিতর্ক: নির্বাচনী প্রচারে ‘মওদুদীবাদের’ দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন ওলীপুরী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেসব দল আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সাথে বে-ইনসাফি করেছে, তাদের প্রতীক কীভাবে আলেমদের মার্কা হতে পারে। উল্লেখ্য, দাঁড়িপাল্লা মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক।

৩. দেওবন্দি-হানাফি আকিদা সংশোধন ঘোষণা: মাওলানা মামুনুল হক কর্তৃক দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে অনভিপ্রেত এবং শতবছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেন ওলীপুরী।

৪. রাজনৈতিক ঐক্যের নজির: মওদুদীবাদীদের (এখানে মওদুদীবাদী বলতে ওলীপুরী জামায়াতে ইসলামীকে ‍বুঝিয়েছেন) সাথে মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যকে হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সাথে ঐক্যের নজির হিসেবে উপস্থাপনকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করা হয়। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মাওলানা মামুনুল হকের পিতা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) বুখারী শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন বিভ্রান্তির দলিলভিত্তিক খণ্ডন করে গেছেন।

৫. ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা: জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন ও ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেওবন্দী আকিদার সঠিক ব্যাখ্যার দাবি জানানো হয়।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে মুরুব্বি হিসেবে উল্লিখিত মাওলানা লিয়াকত আলীর বিষয়ে সাম্প্রতিক এক পোস্টে মামুনুল হক নিজেই তার রাজনৈতিক অভিভাবক (মুরুব্বি) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর তার ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক এবং অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে তিনি আসলেই মুরুব্বি হিসেবে অসুরণ করে কি না, সে বিষয়ে কালবেলা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই ওলীপুরীর চিঠি এবং মাহফুজুল হক ও মিজানুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যের আলোকে প্রতিবেদনে তাদেরকে মুরুব্বি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এটি কালবেলার কোনো বক্তব্য নয়।

ওলীপুরীর পাঠানো ছয় পৃষ্ঠার চিঠি

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স