|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

চাক্তাই-কালুরঘাট মেরিন ড্রাইভে ভয়াবহ বায়ুদূষণ, বিপর্যস্ত জনজীবন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
৩৮৫ পঠিত
চাক্তাই-কালুরঘাট মেরিন ড্রাইভে ভয়াবহ বায়ুদূষণ, বিপর্যস্ত জনজীবন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে চলমান চাক্তাই-কালুরঘাট মেরিন ড্রাইভ প্রকল্প ঘিরে ভয়াবহ বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আশপাশের জনজীবন। বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিক এলাকার পিছনে নদীর তীরে সড়ক নির্মাণের বিটুমিন মিক্সিং প্ল্যান্ট থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ঘন কালো ধোঁয়া। গার্মেন্টসের ঝুট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য...
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে চলমান চাক্তাই-কালুরঘাট মেরিন ড্রাইভ প্রকল্প ঘিরে ভয়াবহ বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আশপাশের জনজীবন। বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিক এলাকার পিছনে নদীর তীরে সড়ক নির্মাণের বিটুমিন মিক্সিং প্ল্যান্ট থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ঘন কালো ধোঁয়া। গার্মেন্টসের ঝুট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পুড়িয়ে বিটুমিন গলানোর ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তদারকির চরম ব্যর্থতা ও দায়সারা ভূমিকার কারণে হাজার কোটি টাকার এ জনহিতকর প্রকল্প আজ জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নগরবাসী। সরেজমিনে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কল্পলোক আবাসিক এলাকার পেছনে নির্মাণাধীন সড়কের পাশে বসানো হয়েছে বিটুমিন মিক্সিং প্ল্যান্ট। প্ল্যান্টের যন্ত্রাংশ ও চিমনি থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আশপাশের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এর পেছনেই সারি সারি বহুতল আবাসিক ভবন। স্থানীয়দের হিসেবে, প্ল্যান্টের প্রায় ১৫০-২০০ গজের মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাটবাড়ি, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা। আশপাশে রয়েছে স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমন জনবসতির পাশে ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া বিটুমিন তৈরির কাজ চলায় পরিবেশের বিপর্যয় নেমে এসেছে। স্থানীয়রা জানান, কখনো সকালে, কখনো বিকেলে গার্মেন্টসের ঝুট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পুড়িয়ে বিটুমিন গলানো হয়। সেখান থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে আশপাশের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। নির্মাণকাজের ধুলাবালিও পরিস্থিতি আরও অসহনীয় করে তুলেছে। এতে শিশুদের বাইরে খেলাধুলা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা ও বমিভাবের মতো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কল্পলোক আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রাশেদ বলেন, আমাদের বাসার ভেতরেও কালো ধুলা জমে। ধোঁয়ার গন্ধে ঘুমানো যায় না। কাছে হওয়ায় বেশি সমস্যা হচ্ছে। ৬-৭ বছর ধরে রাস্তার কাজ চলছে, শেষও হচ্ছে না; এই বিপদও যাচ্ছে না। বাসা পরিবর্তন করব, সেই সুযোগও নেই। বাচ্চারা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এটা কি উন্নয়ন, নাকি আমাদের মেরে ফেলার ব্যবস্থা? আরেক ভুক্তভোগী ফরহাদ বলেন, কয়েক বছর ধরে আমরা এই অবস্থায় আছি। আমার মা অসুস্থ, শ্বাসকষ্ট আছে। নদীর তীর হওয়ায় বাতাসে ধোঁয়া ঘরের ভেতরে চলে আসে। এমন সময়ে মায়ের কাশি বেড়ে যায়। মনে হয় আমরা মানুষ না, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। এত বছর ধরে একটা রাস্তার কাজ চলছে, উন্নয়ন হচ্ছে কোথায়? পরিবেশ গবেষকদের মতে, খোলা জায়গায় প্লাস্টিক, ঝুট বা চামড়াজাত বর্জ্য পোড়ালে বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষতিকর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এমন দূষণ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে শ্বাসতন্ত্রসহ নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতার আশঙ্কা বাড়ে। পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক বেগম সোনিয়া সুলতানা বলেন, সেখানে পরিবেশদূষণ হলে আমরা সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করব। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশদূষণের পাশাপাশি প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পে নতুন ও উন্নতমানের পাথর কেনার বরাদ্দ থাকলেও সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো ভবন ভেঙে পাওয়া পাথর ও পলেস্তারা মিশ্রিত নির্মাণবর্জ্য। নগরের বিভিন্ন স্থানে ভবন ভাঙার পর সেখান থেকে এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে পরে পুরোনো পাথর গুঁড়া করে নতুন পাথরের সঙ্গে মিশিয়ে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে সরেজমিনে পুরোনো ও ভাঙা পাথর দিয়ে নতুন ব্রিজ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কাজ করতে দেখা গেছে। সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ইউনিক ও আধুনিক মানের টেকসই উন্নয়ন করতে চাইলেও, এসব নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে সড়কটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না তা নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞরা। সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সড়কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে বিটুমিনের গ্রেড, গুণগত মান, পাথরের সঙ্গে মিশ্রণের অনুপাত, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতির ওপর। বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণে সাধারণত বিদেশি ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও, বর্তমানে সেখানে নির্ধারিত মানের বাইরে নিম্নমানের বা অনুপযুক্ত বিটুমিন ব্যবহার করে পিচ দেওয়া হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে করে সড়কটি দুই থেকে তিন বছরের বেশি টিকবে না। অতিরিক্ত গরমে পিচ নরম হয়ে সড়কে ঢেউ, চাকার দাগ ও বিকৃতি দেখা দিতে পারে। আবার বিটুমিনের পাথর ধরে রাখার ক্ষমতা কম হলে বৃষ্টির পানিতে পাথর আলগা হয়ে সড়কে গর্ত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাক্তাই-কালুরঘাট প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ চলমান থাকা অবস্থাতেই পিচের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় তলিয়ে গেছে বেড়িবাঁধের বালু ও মাটি। বৃষ্টির পর কিছু স্থানে পিচ ও পাথরের স্তর আলগা হয়ে পড়েছে। এছাড়া সড়কের বিভিন্ন অংশে ফাটল, ভাঙন এবং বিটুমিনযুক্ত পাথর উঠে আসতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী জানান, সড়কের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা সাধারণত বাতাসের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি থাকে। তাই বিটুমিনের গ্রেড নির্বাচনের পাশাপাশি এর সফটেনিং পয়েন্ট, প্রকৃত গুণগত মান, মিশ্রণের অনুপাত এবং সংরক্ষণ ও পরিবহনের নিয়ম মানা হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা কাফিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আবাসিক এলাকা থেকে বলিরহাট-হামিদচর এলাকায় সড়কের কাজ চলছে। এসব কাজে ব্যবহারের জন্য বিটুমিন ও পাথর কল্পলোক আবাসিক এলাকার পেছনে মিশিয়ে এনে ঠিকাদারের লোকজন কাজ করেছেন। অত্যন্ত নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের অধিকাংশ জায়গায় ফাটল দেখা যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্মাণকাজে যুক্ত এক শ্রমিক বলেন, কাজ পেতে কয়েক স্তরে ঘুষ দিতে হয়। সব স্তরে টাকা দেওয়ার পর যে অর্থ থাকে, সেখান থেকে সবাই নিজের লাভ রেখে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালায়। কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে খারাপ লাগে। ভালো মানের নির্মাণসামগ্রী দেওয়া আমাদেরও দায়িত্ব, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কেটে পড়েছে। ইট, বালু, রড, সিমেন্ট সব জায়গায় নরমাল জিনিসপত্র দেওয়া হচ্ছে। ঠিকাদার নিজের ইচ্ছামতো কিছু করতে পারে না, যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষ সায় দেয়। এখানে মূল দায় সিডিএ কর্মকর্তাদের। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক জানান, ভালো মানের বিটুমিন আমদানি করলেও প্রয়োগের আগে বিভিন্ন হাতবদলের সময় তাতে ভেজাল মেশানোর ঘটনা ঘটে। বিটুমিন কোথায়, কী ধরনের বৈজ্ঞানিক পরিবেশে ও তাপমাত্রায় রাখা হবে এবং কীভাবে পরিবহন করা হবে এসব নিয়ম না মানায় এসব সড়ক দুই থেকে তিন বছরের বেশি টেকসই হবে না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্যমতে, কালুরঘাট থেকে চাক্তাই পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের মেরিন ড্রাইভ বা বেড়িবাঁধ-কাম-সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। নগরকে জোয়ার ও বন্যার পানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে দুই দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, অর্থাৎ মূল বরাদ্দের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৪৬৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। মাঠপর্যায়ে ভৌত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন স্থানে অসমাপ্ত কাজ ও নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ পড়ে রয়েছে। প্রকল্পের নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার অনিয়মের নেপথ্যে প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীবের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের সঙ্গে যোগসাজশে সিডিএর একটি চক্র জনগণের কোটি কোটি টাকা লুটেপুটে খেলেও সংস্থাটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক রাজীবের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকার কাজে ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কল কেটে দেন। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দেওয়া হলেও সাড়া দেননি। অনিয়মের বিষয়ে সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, বিগত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অনেক কাজ হয়েছে দায়সারাভাবে। রাস্তার ওপরের অংশ সুন্দর করা হলেও নিচের সাব-বেস, কার্পেটিং ও সিলকোটের কাজ যথাযথ হয়নি। তবে বর্তমান প্রশাসনের সময়ে শুরু হওয়া কাজে গুণগত মান নিশ্চিত করতে নকশা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উপকরণের অনুপাত কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স