চীনে এআইয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবন ও আচরণে নজরদারি চালানোর শঙ্কা
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩১ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির এক আইন গবেষক।
তার আশঙ্কা, নাগরিকদের অনলাইন ও বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ড থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের আচরণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের এই ব্যবস্থা...
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির এক আইন গবেষক।
তার আশঙ্কা, নাগরিকদের অনলাইন ও বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ড থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের আচরণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের এই ব্যবস্থা একপর্যায়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, বৈষম্য এবং ব্যাপক নজরদারির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের (এসসিএমপি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চীনের সিচুয়ান নরমাল ইউনিভার্সিটির জার্নালে গত মাসে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের পিএইচডি গবেষক লিন জিয়ানশিং। সরকার অর্থায়িত গবেষণাটিতে সামাজিক শাসনব্যবস্থার মডেল ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন নিয়ে সিচুয়ান প্রদেশের একটি প্রকল্পের আওতায় কাজ করা হয়েছে।
গবেষক লিনের মতে, সামাজিক রেটিং ব্যবস্থা বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নাগরিকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে পরিমাপযোগ্য সূচকে রূপান্তর করে। এর মাধ্যমে সরকারি সংস্থাগুলো নাগরিকদের সম্ভাব্য আচরণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। পাশাপাশি ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
তবে এ ধরনের অ্যালগরিদমনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিন বলেন, ‘ঝুঁকি মূল্যায়নভিত্তিক এ ধরনের ব্যবস্থা তথ্যের অস্বচ্ছতা, ব্যাপক নজরদারি ও বৈষম্যের মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।’
লিনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, সামাজিক রেটিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশাসনিক সংস্থাগুলো বিগ ডেটা বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসমূলক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডকে পরিমাপযোগ্য স্কোরে রূপান্তর করে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড ও ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া।
গবেষক উল্লেখ করেছেন, কোনো ব্যক্তির স্কোর বেশি বা কম হওয়ার কারণে তার অধিকার ও দায়িত্ব সরাসরি পরিবর্তিত হচ্ছে—বিষয়টি বাইরে থেকে এমন মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক ঋণ এবং সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ওই স্কোর প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা কী
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা হলো নাগরিক, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সততা, আচরণ ও বিশ্বস্ততা মূল্যায়ন করার জন্য চীন সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত একটি দেশব্যাপী প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো। ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে ব্যবস্থাটিকে প্রায়ই এমন একটি সর্বক্ষমতাধর স্কোরিং প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী সরকার নাগরিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে চীনের ভেতরে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে এ ব্যবস্থার উপস্থিতি বা বাস্তব প্রভাব খুব বেশি অনুভব করেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গত বছর প্রকাশিত একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা কোনো একক ও সমন্বিত নেটওয়ার্ক নয়। বরং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিচালিত একাধিক পরীক্ষামূলক উদ্যোগের সমন্বয়ে এটি গড়ে উঠেছে।
নিবন্ধটিতে ব্যবস্থাটিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কালো তালিকা তৈরি এবং আর্থিক ঋণসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেডিট রিপোর্টিং ব্যবস্থা।
আরেকটি শ্রেণিতে রয়েছে পৌর সরকারের পরিচালিত এমন ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের আচরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পুরস্কার ও শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। লিনের গবেষণায় আলোচিত ব্যবস্থার সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
চীনের সরকার সামাজিক শাসনব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে। গত বছর দেশটির স্টেট কাউন্সিল প্রকাশিত একটি কর্মপরিকল্পনায় সরকারি খাতে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খলভাবে এআইয়ের ব্যবহার এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়। এর লক্ষ্য জনসেবা প্রদানের এমন একটি নতুন মডেল তৈরি করা, যা ‘সুনির্দিষ্টভাবে প্রয়োজন শনাক্ত করবে, আগাম সেবা পরিকল্পনা করবে এবং সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পন্ন করবে’।
এর উদাহরণ হিসেবে মধ্য চীনের আনহুই প্রদেশের একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের একটি গতিশীল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। এর লক্ষ্য সামাজিক সেবার কার্যকারিতা বাড়ানো।
এআই ব্যবহারে যেসব ঝুঁকির শঙ্কা
সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থায় এআই যুক্ত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন গবেষক লিন। এর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যালগরিদমের নির্ভরযোগ্যতা। সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের মান এবং মডেল তৈরির পদ্ধতির মতো বিষয়গুলোর ওপর অ্যালগরিদমের কার্যকারিতা নির্ভর করে। ফলে তথ্য বা মডেলের ত্রুটি ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়নেও ভুল তৈরি করতে পারে।
লিন সতর্ক করে বলেন, কঠোর তথ্য-সংক্রান্ত বিধিবিধান ও তদারকি ব্যবস্থা না থাকলে নাগরিকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৈরি হওয়া তথ্যের ছাপ ব্যবহার করে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা হতে পারে। এতে ব্যবস্থাটি ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার থেকে আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিণত হতে পারে’।
গবেষকের মতে, সামাজিক রেটিং ব্যবস্থা সরকারকে নাগরিকদের প্রয়োজন শনাক্ত করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুমান করা এবং প্রশাসনিক সম্পদ বণ্টনে সহায়তা করতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা দুটি বিষয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রথমটি হলো তথ্য ও স্কোর নির্ধারণকারী অ্যালগরিদমের গুণগত মান, আর দ্বিতীয়টি হলো প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের মান ও নিয়মতান্ত্রিকতা।
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থাকে প্রায়ই এমন একটি অভিন্ন ও ভীতিকর কাঠামো হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিটি আচরণ পর্যবেক্ষণ করে স্কোর দেওয়া হয় এবং জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে। তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধটি এ ধরনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, চীনের অল্পসংখ্যক শহরে এ ধরনের স্থানীয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় সরকারি কর্মীদের কর্মকাণ্ডকে বেশি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জনসাধারণের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদেরও ‘শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার’ রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স