|
| |
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
১৯৩ পঠিত
ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

একসময় তাঁদের মূল পারিবারিক ব্যবসা ছিল ঘি। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবসার পরিসর বদলেছে, ঘিয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মিষ্টির জগতে পা রেখেছেন তাঁরা। দুধ, ছানা, ক্ষীর আর চিনির মিশেলে তৈরি হয়েছে নতুন পরিচয়। বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা। ঘি থেকে মিষ্টির জগতে আসা বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারে এখন তৈরি হয় প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি। সারা দেশে রয়েছে প্রায় ৪৫টি শাখা। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তাদের পারিবারিক পূজার আয়োজন দেখতে গিয়ে তাঁদের এই দীর্ঘ মিষ্টির যাত্রার গল্প শুনলেন তারেক হাসান সরকার

পুরান ঢাকার ভোর, দুধ চা আর প্রাণহরা

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ব্রিটিশ আমলে ঘিয়ের ব্যবসা করতেন তাঁদের পূর্বপুরুষেরা। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান পরিচালকদের একজন দীপক কুমার ঘোষ জানালেন, দুধ ও ঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করার চিন্তা থেকেই মিষ্টি তৈরির উদ্যোগ। ঘি দিয়ে শুরু হয়েছিল যে ব্যবসা, সেখানে একসময় জায়গা করে নেয় রসগোল্লা, চমচম, কালোজামসহ নানা ধরনের মিষ্টি।

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
অভিজ্ঞ কারিগরের হাতের গুণেই অনেক সময় একটি মিষ্টি অন্যটির চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে

তাঁদের আদি দোকানটির নাম কিন্তু বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার নয়। পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা প্রথম দোকানটির নাম ছিল ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’। একসময় প্রতিষ্ঠানটির সকালের নাশতা ছিল বেশ জনপ্রিয়। নাশতার সঙ্গে থাকত দুধ চা। তবে তখনো দোকানটির সবচেয়ে জমজমাট পণ্য ছিল ঘি। আর ছিল বিশেষ ধরনের ‘প্রাণহরা’, স্বাদে ও প্রস্তুতপ্রণালিতে যা ছিল অন্য সব মিষ্টির চেয়ে আলাদা। এই মিষ্টির ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরোনো। সাগরকলা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হতো এই মিষ্টি। তবে এর প্রস্তুতপ্রণালির সঙ্গে যুক্ত দক্ষ কারিগরেরা এখন আর বেঁচে নেই। এ কারণে আগের মতো করে প্রাণহরা তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরবর্তী ধাপে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে কলাবাগানে যাত্রা শুরু করে ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার’।

১৮৫ রকম মিষ্টির ভিড়ে চেনা স্বাদ

ঘোষ পরিবারের আরেক সদস্য প্রমিত কুমার ঘোষের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠাকুরদার বাবার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চার প্রজন্ম মিষ্টান্ন ভান্ডারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এক প্রজন্ম যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, পরের প্রজন্ম তা ধারণ করেছে নিজেদের মতো করে। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিসর বদলেছে, ব্যবসার মূল ভিত্তি এখনো পারিবারিক সম্পর্ক। এখনো ব্যবসাটি পরিবারের ২৪ সদস্য মিলে পরিচালনা করছেন।

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
দুধের মান, ছানার ঘনত্ব, ক্ষীরের প্রস্তুতি, চিনির পরিমাণ কিংবা রসের মিশ্রণ—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে মিষ্টির চূড়ান্ত স্বাদ

সময়ের সঙ্গে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টির তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন মিষ্টি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন এর প্রতিনিধি। পরিচিত মিষ্টির পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের মালাই, ক্ষীর ও বিশেষ প্রণালিতে তৈরি মিষ্টান্ন। রসগোল্লা, লালমোহন, কালোজাম, চমচম ও ক্ষীর চমচমের মতো মিষ্টি সারা বছরই ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় থাকে। এ ছাড়া রসমালাই, সরমালাই, ক্ষীরমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ, জাফরানি ভোগ ও কাশ্মীরি চমচমের মতো মিষ্টিও তৈরি করা হয়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু মিষ্টি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ঋতুর সম্পর্ক গভীর। সেগুলো সারা বছর পাওয়া যায় না। উপকরণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব প্রস্তুতপ্রণালি বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মৌসুমেই তৈরি করা হয় কয়েক ধরনের মিষ্টি। যেমন শীত এলে ক্ষীর কদমের চাহিদা বাড়ে।

আর কমলাভোগের গল্পটি আরও আলাদা। প্রমিত কুমার ঘোষের ভাষ্য অনুযায়ী, কমলার খোসা বেটে ছানার সঙ্গে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। কমলার মৌসুমেই এটি তৈরি করা হয়। অনেক দোকানে সারা বছর কমলাভোগ বিক্রি হলেও বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার নিজস্ব প্রস্তুতপ্রণালি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট মৌসুমে এটি তৈরি করে বলে জানান তিনি। এখানে মিষ্টির স্বাদ শুধু চিনি, দুধ কিংবা ছানার ওপর নির্ভরশীল নয়; নির্ভর করে উপকরণের মৌসুম, তার বৈশিষ্ট্য এবং তৈরির পদ্ধতির ওপরও। কমলাভোগ তাই শুধু একটি মিষ্টি নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ঋতুর স্বাদকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা। আবার পূজা-পার্বণ এলে বাড়ে লাড্ডুর চাহিদা।

দুধ, ছানা আর কারিগরের হাত

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
সময়ের সঙ্গে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টির তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন মিষ্টি

মিষ্টি তৈরির প্রস্তুতপ্রণালি সম্পর্কে প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, দুধের মান, ছানার ঘনত্ব, ক্ষীরের প্রস্তুতি, চিনির পরিমাণ কিংবা রসের মিশ্রণ—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে মিষ্টির চূড়ান্ত স্বাদ। মিষ্টিতে দুধের ব্যবহার বেশি। এ ছাড়া অধিকাংশ কাঁচামাল যেমন দুধ, ছানা, ক্ষীর ও মাওয়া মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় কলাবাগান ও ইংলিশ রোডে তাঁদের কারখানায় আনা হয়। মিষ্টির ধরন অনুযায়ী এলাচি, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী, লবঙ্গ ও চিনি ব্যবহার করা হয়। কোনো মিষ্টিতে দুধ ও ছানার স্বাদ প্রাধান্য পায়, আবার কোনো মিষ্টিতে ক্ষীর ও বিশেষ মসলার ব্যবহার স্বাদে আনে ভিন্নতা।

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
পূজা-পার্বণ এলে বাড়ে লাড্ডুর চাহিদা

প্রমিত কুমারের দাবি, মিষ্টি তৈরিতে তাঁরা কোনো প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করেন না। তবে তিন-চার ধরনের মিষ্টিতে খাবারের রং ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ড্রাগন সুইটস, অরেঞ্জ লাড্ডু ও কমলাভোগ। তিনি জানান, ড্রাগন সুইটস ও মাল্টি লাড্ডুতে ফুড রেড কালার ব্যবহার করা হয়।

প্রমিত কুমারের ভাষ্য, চিনির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলে মিষ্টি কিছুটা বেশি সময় ভালো থাকে। তবে মিষ্টির সংরক্ষণকাল শুধু চিনির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; উপকরণের মান, তৈরির পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণের তাপমাত্রাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দুধ ও ছানার তৈরি মিষ্টির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

শতাধিক কারিগর, তিন শ কর্মীর সংসার

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
প্রতিটি মিষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা দক্ষতা

মিষ্টি তৈরির পেছনে থাকে নানা উপকরণের সমন্বয়। কিন্তু সেই সমন্বয়কে সঠিক স্বাদ ও গঠনে রূপ দেন কারিগরেরা। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে সব মিলিয়ে প্রায় তিন শ কর্মী কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে মিষ্টি তৈরির কাজে যুক্ত কারিগরই আছেন শতাধিক। প্রতিটি মিষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা দক্ষতা। কোথাও ছানাকে নির্দিষ্ট ঘনত্বে আনতে হয়, কোথাও ক্ষীর তৈরি করতে হয় যত্ন নিয়ে, আবার কোথাও নিশ্চিত করতে হয় রসের সঙ্গে মিষ্টির সঠিক সমন্বয়। অভিজ্ঞ কারিগরের হাতের গুণেই অনেক সময় একটি মিষ্টি অন্যটির চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে। এই কারিগরি দক্ষতা শুধু বর্তমান উৎপাদনের জন্য নয়, প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণহরার মতো মিষ্টির প্রস্তুতপ্রণালি হারিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, কারিগরদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা, লিখে রাখা এবং নতুনদের শেখানো কতটা প্রয়োজন।

৪৫ শাখার বিস্তার, সামনে নতুন পথ

ছিল ঘিয়ের ব্যবসা, এখন তৈরি করে ১৮৫ রকম মিষ্টি, চার প্রজন্মের গল্পে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার
মাছ সন্দেশ

পুরান ঢাকায় একটা দোকান থেকে শুরু হওয়া ব্যবসা এখন অনেক বড় হয়েছে। প্রমিত কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁদের প্রায় ৪৫টি শাখা। সামনে আরও কয়েকটি শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিস্তার একদিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ। এক শাখার মিষ্টির স্বাদ অন্য শাখায় অক্ষুণ্ন রাখা, কাঁচামালের মান নিশ্চিত করা, কারিগরদের দক্ষতা বজায় রাখা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা—সবই বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নকল মিষ্টির সমস্যা। প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল মিষ্টি বিক্রি করছেন। এমন প্রায় ৩০০ ঘটনা শনাক্ত করেছেন তাঁরা। তাঁদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ও মৌসুমি মিষ্টির সম্পর্ক রয়েছে, তাদের জন্য এই ভারসাম্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন শাখা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো প্রস্তুতপ্রণালি সংরক্ষণ, হারিয়ে যেতে বসা মিষ্টি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা এবং অভিজ্ঞ কারিগরদের জ্ঞান নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো