|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

জেন–জির গন্তব্য কেন বিদেশ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম
২১০ পঠিত
জেন–জির গন্তব্য কেন বিদেশ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
জেন–জিদের মধ্যে ব্যাপক হারে বাড়ছে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা।

স্নাতকের শেষ, কিন্তু এই শেষ মানেই কি সত্যি শেষ? নাকি নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি? সকালে ক্লাস, এর ফাঁকে আড্ডা, দুপুরে বাড়ি এসে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে আরামের এক ভাতঘুম। শেষ বর্ষে এসে এই জীবন বদলে যায় চোখের পলকে। চাকরি, ইন্টারভিউ, সিভি—এ যেন হুট করে বড় হওয়ার চেষ্টা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে নতুন চিন্তা—বিদেশ যেতে হবে।

জেন–জিদের মধ্যে ব্যাপক হারে বাড়ছে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। উপাত্ত থেকে বোঝা যায় এই ধারা। ইউনেসকোর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার ৮০০। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৪ হাজারের কিছু বেশি। এক দশকে দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু কেন এই প্রবণতা? কেনই–বা জেন–জিদের গন্তব্য এখন বিদেশ?

তাসমিম বিনতে করিম অমি। বর্তমানে অবস্থান করছেন কানাডার সেন্ট জন শহরে। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন আরও চার বছর আগে, উচ্চমাধ্যমিক শেষে। তাঁর ভাষ্যমতেও গল্পটা প্রায় একই। ভর্তিযুদ্ধ নামক চ্যালেঞ্জে হেরে যাওয়ার ভয়টা ছিল ব্যাপক।

ভর্তির অসুস্থ প্রতিযোগিতা

স্নাতক–পরবর্তী বিদেশযাত্রা নিয়ে কথা বলার আগে বলতে হয় উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপেই যাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে। এইচএসসির পর এমন কঠিন সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে নানা কারণ। তবে এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়েন গড়ে ৩৬ জন। ধীরে ধীরে এ ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। এ ধরনের প্রতিযোগিতা দেশে থেকে ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করছে।

তাসমিম বিনতে করিম অমি। বর্তমানে অবস্থান করছেন কানাডার সেন্ট জন শহরে। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন আরও চার বছর আগে, উচ্চমাধ্যমিক শেষে। তাঁর ভাষ্যমতেও গল্পটা প্রায় একই। ভর্তিযুদ্ধ নামক চ্যালেঞ্জে হেরে যাওয়ার ভয়টা ছিল ব্যাপক। সেই থেকেই পড়াশোনার জন্য বেছে নেন বিদেশ। তবে সেই পথও যে সহজ ছিল, তা নয়।

উন্নত শিক্ষা

স্নাতক শেষে দেশের একজন শিক্ষার্থীর সামনে তিনটি পথ খোলা থাকে। এক. বিসিএস; দুই. ভালো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা; তিন. বিদেশে উন্নত জীবনের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া। প্রথম দুটিতেই লাখ লাখ প্রতিযোগী। ফলে উপায় বিদেশে পাড়ি। এ পথেই একটু হলেও আশার আলো দেখতে পান শিক্ষার্থীরা।

কথা হচ্ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এবং পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তির সঙ্গে। পড়াশোনা করছেন শেষ বর্ষে। স্নাতকোত্তর যখন ছুঁই ছুঁই, তখন মাথায় যেন শুধুই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। এর একটি বড় অংশে আছে চাকরি, সেই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশযাত্রা। আইইএলটিএস, এসওপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্পনসরের কাগজ—কাজের যেন শেষ নেই। এত ঝামেলার পরেও বিদেশই কেন প্রথম পছন্দ? প্রশ্নের জবাবে জান্নাতুল বলেন, ‘উন্নত মানের শিক্ষাই প্রথম কারণ। আমার বিষয়ে বাংলাদেশে শুধু তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ আছে। ফলে বুঝতেই পারছেন, না চাইলেও ভালো সুযোগের জন্য ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতেই হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা বাবদ ৬৬ কোটি ডলারের বেশি পাঠিয়েছেন। বড়সড় এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন জেন–জিরা দেশের চেয়ে বিদেশকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। যার মূলে তাঁরা চাকরি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে রাখছেন।

অনিশ্চিত চাকরিবাজার

তবে শুধু উন্নত মানের শিক্ষাই নয়, চাকরির অনিশ্চয়তাও তরুণদের দেশ ছাড়ার বড় কারণ। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মাধ্যমিক–উত্তর শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার।

এই যদি হয় চাকরির বাজার, তবে বিদেশ ছুটে যাওয়াই শ্রেয় নয়কি? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা বাবদ ৬৬ কোটি ডলারের বেশি পাঠিয়েছেন। বড়সড় এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন জেন–জিরা দেশের চেয়ে বিদেশকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। যার মূলে তাঁরা চাকরি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে রাখছেন।

দূর থেকে রঙিন মনে হলেও বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন উপলব্ধি হরহামেশাই দেখা যায়। সেই সঙ্গে নতুন একটি দেশে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আলাদা চাপ তো আছেই। তবে এত চ্যালেঞ্জের পরও বিদেশটাই যেন আশার আলো।

দরজার ওপাশের গল্প

তাসমিমের গল্পে ফিরে আসা যাক। দেশ ছেড়েছিলেন চার বছর আগে। পরিবার থেকে দূরে আছেন এই দীর্ঘ সময়জুড়ে। সুযোগ হয়নি একবারও দেশে ফেরার। তবে যে কারণে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন, তাতে অনেকটাই সফল হয়েছেন। ব্যক্তিস্বাধীনতা, উন্নত শিক্ষা ও জীবনযাপন—সবই পেয়েছেন। তবে সেই সঙ্গে না পাওয়ার গল্পও আছে অনেক। তাসমিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিদেশের জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটিকে মনে করেন তিনি। এককথায় উত্তর ছিল, একা যেকোনো পরিস্থিতি সামলে নেওয়া। তিনি বলেন, ‘বিদেশে থাকার চ্যালেঞ্জ সবার জন্য একরকম নয়। এটি অনেকটা নির্ভর করে কে কেমন পরিবেশে বড় হয়েছে। আমি অনেক মানুষের মধ্যে বড় হয়েছি, তাই কানাডায় এসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মেলামেশার জন্য মনের মতো মানুষ না পাওয়া।’

দূর থেকে রঙিন মনে হলেও বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন উপলব্ধি হরহামেশাই দেখা যায়। সেই সঙ্গে নতুন একটি দেশে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আলাদা চাপ তো আছেই। তবে এত চ্যালেঞ্জের পরও বিদেশটাই যেন আশার আলো।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ

বিদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে নারী শিক্ষার্থীরা যেন একটু এগিয়ে। এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সেই সঙ্গে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। দেশের রাস্তাঘাটে অশালীন মন্তব্য ও চাহনি, অনিরাপদ গণপরিবহন, অল্প বয়সে বিয়ের চাপ থেকে বাঁচতে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নারীরা বেছে নিচ্ছেন বিদেশকে।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও যেন একই কথা বলে। ২০২১ সালে পরিচালিত জার্মানির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় ব্যবধান। জরিপে অংশ নেওয়া ৫ হাজার ৪০৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ শতাংশ ছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ২০ শতাংশ।

কানাডা ২০২৬ সালে নতুন শিক্ষার্থীর জন্য রেখেছে মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার আসন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় জটিলতা আর খরচ বাড়ায় অনেকে এখন ভাবছেন এশিয়া ও ইউরোপের দিকের দেশগুলো নিয়ে। সে ক্ষেত্রে জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো থাকছে আগ্রহের তালিকায়।

আছে অন্য রকম গল্পও

বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হাজার হাজার জেন–জির মধ্যে আছে ভিন্ন গল্পও। এমন একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি বিদেশমুখী হতে চান না। কারণ হিসেবে বলছেন, প্রবাসে একলা জীবনযাপন। তিনি বলেন, ‘দেশে আমরা ছোটবেলা থেকে যে ধরনের পরিবেশের সঙ্গে বড় হয়েছি, বিদেশে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সামাজিকতার সংজ্ঞাটাও বেশ আলাদা। এমন হইহুল্লোড়ের মধ্যে বড় হওয়ার পর বিদেশ গিয়ে একা জীবনযাপনের বিষয়টা আমার কাছে বেশ কঠিন মনে হয়। ইচ্ছা ও সাহস থাকলে দেশেও ভালো করা সম্ভব।’

কানাডার ফ্রেডেরিকটনে বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে কানাডা দিবস উদ্যাপন

আশা আছে, ঝুটঝামেলাও আছে

আশা আছে, তবে পথটা সহজ নয়। আইইএলটিএসের নির্দিষ্ট স্কোর, ভর্তির চিঠি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্পনসরের কাগজ, এরপর ভিসার সাক্ষাৎকার। প্রতিটি ধাপে রয়েছে অপেক্ষা, আর শেষ ধাপে এসে ব্যর্থতার ঝুঁকি। সেই সঙ্গে দেশভিত্তিক বিধিনিষেধ তো থাকছেই।

কানাডা ২০২৬ সালে নতুন শিক্ষার্থীর জন্য রেখেছে মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার আসন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় জটিলতা আর খরচ বাড়ায় অনেকে এখন ভাবছেন এশিয়া ও ইউরোপের দিকের দেশগুলো নিয়ে। সে ক্ষেত্রে জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো থাকছে আগ্রহের তালিকায়। এ বছর জাপানের সাগা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাড়ি জমিয়েছেন, যা প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় বিদেশি শিক্ষার্থী দল। সেই সঙ্গে ঢাকায় বিভিন্ন ভাষা শেখা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে দ্রুত। সুতরাং গন্তব্য বদলালেও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বদলায়নি।

শুধু পড়তে নয়, জীবিকার খোঁজেও

অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এদের একটা অংশ জেনজির মধ্যে পড়েন। দেশে কাজের অভাবের তীব্রতা বাংলাদেশের তরুণ ও যুবকদের মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ–আমেরিকামুখী করে তোলে।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান একটা উৎস প্রবাসী শ্রমিক। ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাত্রাকালে কিংবা কাভার্ড ভ্যানে চড়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুর খবর আমাদের বিষণ্ন করে তোলে। জেনজি যেমন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের মায়া ছেড়ে উড়াল দেয়, তেমনি তাদের একটা বিশাল অংশ কাজের সন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করে না।

হৃদয়ে বাংলাদেশ

জেন–জিদের গন্তব্য এখন বিদেশ। তবে তাঁদের মধ্যে অনেকেই ফিরে এসে দেশের জন্যও কাজ করতে চান। অনেকের ইচ্ছা নিজের অবস্থান থেকে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার। এমন প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন নতুন এই প্রজন্মের অনেকে।

  • জাহিন যাঈমাহ্ কবির: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী

সূত্র: প্রথম আলো