প্রতিটি দিন যেভাবে গতকালের চেয়ে উন্নত করবেন
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রবাদ আছে—‘যার দুটি দিন সমান হলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত; আর যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে খারাপ হলো, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ ইসলামি জীবনদর্শনে এই বাক্যটির অন্তর্নিহিত বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
সময় একমুখী; যা একবার চলে যায়, তা আর ফেরে না। একজন মুমিনের প্রতিটি দিন শুধু নতুন একটি সূর্যোদয় নয়, বরং আত্মউন্নয়ন ও গতকালের ভুল শুধরে নেওয়ার নতুন সুযোগ।
কীভাবে আমাদের প্রতিটি দিনকে গতকালের চেয়ে উন্নত করা যায়, তার কয়েকটি বাস্তবমুখী উপায় তুলে ধরা হলো।
১. আত্মসমালোচনা করা
আজকের দিনকে গতকালের চেয়ে উত্তম করতে হলে প্রথমে গতকালের লাভ-ক্ষতির হিসাব নেওয়া জরুরি। ইসলামে এই আত্মপরীক্ষাকে বলা হয় ‘মুহাসাবা’।
খলিফা ওমর (রা.) এই আত্মোপলব্ধির তাগিদ দিয়ে বলতেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও এবং চূড়ান্ত হাশরের পেশির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
রাতে ঘুমানোর আগে বা দিনের শুরুতে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—গতকাল কী ভালো কাজ করেছি, আর কী ভুল করেছি।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য করা উচিত যে আগামীকালকের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ১৮)
গতকাল হয়তো কোনো পাপকাজ, কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ বা অলসতায় সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আজকের দিনটিকে ভালো করার অন্যতম উপায় হলো অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনা করা এবং তা শুধরে নেওয়ার সংকল্প করা।
২. ভোরের সূচনায় ইতিবাচক পরিকল্পনা
দিনের সূচনা যদি সুন্দর হয়, তবে পুরো দিনের গতিপথ বদলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর দরবারে আয়ু পাওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং দোয়ার মাধ্যমে শুভ সূচনা করা উচিত।
ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয়ের সময়টুকু অলসতায় না কাটিয়ে দিনের কাজ ও লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগানো বরকতময়।
সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজে নামলে সময়ের অপচয় বন্ধ হয় এবং নতুন দিনে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
৩. ভুলের ক্ষতিপূরণ ও তওবা
গতকাল হয়তো কোনো পাপকাজ, কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ বা অলসতায় সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আজকের দিনটিকে ভালো করার অন্যতম উপায় হলো অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনা করা এবং তা শুধরে নেওয়ার সংকল্প করা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অন্যায়ের পরপরই কোনো ভালো কাজ করো, যা সেই অন্যায়কে মুছে দেবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৭)
গতকালের ত্রুটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আজ অন্তত একটি অতিরিক্ত সৎকাজ করে জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
৪. নিয়তের পরিচ্ছন্নতা
যেকোনো কাজের কল্যাণ নির্ভর করে নিয়তের ওপর। আজ যা কিছুই করা হবে—জীবিকার সন্ধান, পড়াশোনা, পরিবারকে সময় দেওয়া বা সামাজিক সেবা—সবই যদি সৎ নিয়তে করা হয়, তবে তা ইবাদতে পরিণত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
প্রতিদিন সকালে জাগতিক কাজের পেছনেও মহৎ উদ্দেশ্য যুক্ত করলে তা আত্মিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা তৈরি করে।
৫. ছোট কিন্তু ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি
এক দিনেই জীবন পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক অগ্রগতি। গতকালের চেয়ে আজ একটি অতিরিক্ত ভালো কাজ করা বা একটি মন্দ অভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টাই হলো আসল সফলতা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
আজ যদি একটি নতুন শুভ অভ্যাস বা চর্চা যুক্ত করা যায়, তবে গতকালের তুলনায় আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে অনন্য হয়ে উঠবে।
ইবনে রজব আল-হাম্বলি প্রাচীন এক মনীষীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি তো শুধু কতগুলো দিনের সমষ্টি; যখনই একটি দিন চলে যায়, তোমার জীবনের একটি অংশও ক্ষয় হয়ে যায়।’ (আল-হাম্বলি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৩৮২, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০১)
সূত্র: প্রথম আলো