ফলোয়ার ২১ লাখ, বিক্রি ৩৩!
গণমাধ্যম ডেক্স
ফেসবুকে রিলস দিলেই রকেটের গতিতে লাইক-কমেন্টের সুনামি বয়ে যায়, এমন মহা ইনফ্লুয়েন্সার সামিউল ভাই।
ফলোয়ারের সংখ্যা শুনলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে: ২১ লাখ ৩ হাজার ৫২৬! নিজের নামের আগে ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’, ‘কনটেন্ট কিং’ লিখতে লিখতে সামিউল ভাইয়ের আঙুলে কড়া পড়ে গেছে।
এবার অমর একুশে বইমেলায় সামিউল ভাইয়ের মনে সুপ্ত সাহিত্যিক জেগে বসল। ভাবলেন, এত বড় ফ্যানবেজ, বই বের করলেই তো হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে যাবে!
কাগজের গন্ধ কেমন, তা সামিউল ভাই জীবনেও কোনো দিন শুঁকেছেন কি না সন্দেহ, তবু জেদ ধরে একটা বই লিখে ফেললেন। বইয়ের নাম ‘জীবনের গতিপথ, যেভাবে বদলায়’।
প্রকাশনা সংস্থার মালিক তো খুশিতে গদগদ। ভেবেছিলেন, ২১ লাখ ফলোয়ারের অন্তত ১ লাখ মানুষও যদি বই কেনে, তাহলে তিনি রাতারাতি বড়লোক!
মেলা শুরু হলো। প্যাভিলিয়নের সামনে বিশাল ব্যানার, সামিউল ভাইয়ের রাজকীয় ছবি। কিন্তু হায়! কিসের কী!
সারা বইমেলা ঘুরে সামিউল ভাইয়ের বই বিক্রি হলো মাত্র ৩৩ কপি! আর সেই ৩৩ কপির ভেতরেও করুণ এক পারিবারিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ছোট চাচা কিনেছেন ৫ কপি, মামা কিনেছেন ৩ কপি, খালাতো ভাই জোর করে দোকানদারের কাছ থেকে ৩ কপি বাকিতে বাগিয়ে নিয়েছে। পরের সপ্তাহে টাকা দেবে। অর্থাৎ রক্তসম্পর্কের বাইরে সাধারণ জনগণের কাছে সর্বসাকুল্যে বই বিক্রি হয়েছে মাত্র ২২ কপি! বন্ধুরা একটা কপি বইও কিনল না।
রাত গড়াতেই ফেসবুকে নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে গেল। ২১ লাখ ফলোয়ারের মানুষজন স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ‘সামিউল ভাইয়ের বইমেলায় গিয়ে দারুণ আড্ডা হলো। বই নিয়ে ছবিও দিলাম। বইটা ফাটাফাটি চলছে!’
অথচ সামিউল ভাইয়ের স্টলের সামনে তিলধারণের জায়গা নেই। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা অবধি সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে গেছে।
‘আরে সামিউল ভাই! কী ক্যারেক্টার বস, আপনি! একটা সেলফি, প্লিজ!’
সামিউল ভাই পোজ দিতে দিতে ক্লান্ত। এক হাত দিয়ে দাঁত বের করে হাসছেন, অন্য হাত দিয়ে বইটা বাড়িয়ে ধরে বলছেন, ‘ভাই, বইটা একটু উল্টে দেখেন, জীবনের ফিল্টার কেটে একদম রিয়েল সাকসেস চলে আসবে!’
ফ্যান উৎসাহের সঙ্গে বইটা হাতে নিয়ে দুই পাতা ওলটাল। তারপর একগাল হেসে বলল, ‘অসাম, ভাই! কী সুন্দর প্রিন্টিং! আপনার চুলগুলা কিন্তু রিলসে আরও সুন্দর লাগে!’ বলেই পকেট থেকে আইফোন বের করে একটা সেলফি তুলল।
ফেসবুকে চেক-ইন দিয়ে ক্যাপশন জুড়ে দিল, ‘কিংয়ের সাথে বইমেলা জমিয়ে দিলাম! বস সামিউল ভাইয়ের নতুন বই ভালোই লেগেছে! মাস্ট রিড বই!’
এরপর ফ্যান ভাই একটা বড় ধন্যবাদ জানিয়ে হাওয়া। বইটা যে কিনতে হবে, এ বুদ্ধি যেন ফ্যানদের মগজে কোনোভাবেই কাজ করছে না।
সামিউল ভাই স্টলের কাউন্টারে বসে ঘাম মুছছেন। একটু পর এক তরুণী এসে ক্যাঁদো ক্যাঁদো গলায় বলল, ‘ভাইয়া, আপনার বইটা না মাখনের মতো জোশ! আমি তো পড়ে শেষ করে ফেলেছি!’
সামিউল ভাই সঙ্গে সঙ্গে মুখ উজ্জ্বল করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাই নাকি, আপু? কোন চ্যাপ্টারটা আপনার সেরা লেগেছে?’
তরুণী দাঁত কেলিয়ে বলল, ‘আরে ভাইয়া, বই কে পড়েছে! আমি তো খালি আপনার ছবির পেজটা ছিঁড়ে ডায়েরিতে আটকে রেখেছি। লাভ ইউ, ভাই!’
বলেই তরুণী একটা সেলফি তুলে দৌড় দিল। সামিউল ভাই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতে চাইলেন। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে কি কাঁদা যায়!
রাত গড়াতেই ফেসবুকে নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে গেল। ২১ লাখ ফলোয়ারের মানুষজন স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ‘সামিউল ভাইয়ের বইমেলায় গিয়ে দারুণ আড্ডা হলো। বই নিয়ে ছবিও দিলাম। বইটা ফাটাফাটি চলছে!’
কমেন্ট বক্সে সবাই আগুনের ইমোজি দিচ্ছে। বাহ্বা দিচ্ছে। কিন্তু ক্যাশ বাক্সে জমা পড়েছে কেবল ৩৩টি বইয়ের টাকা।
সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে সামিউল ভাই পকেট হাতড়ে দেখলেন, লেখক হওয়ার স্বপ্নটা আছে, কিন্তু চায়ের বিল দেওয়ার মতো টাকা নেই!
লোকে সেলফি তুলে বাহ্বা দেয় ঠিকই, কিন্তু ফেসবুকের লাইক, কমেন্ট, শেয়ার দিয়ে তো আর ভাতের হাঁড়ি চড়ে না।
সামিউল ভাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, পরের বই আর ছাপাবেন না। এবার ফেসবুক আর টিকটকে রিলস বানিয়ে চাল-ডাল কিনবেন! কারণ, ২১ লাখ মানুষ তাঁকে অনুসরণ করলেও ১ লাখ মানুষও তাঁর বই কিনতে রাজি নয়!
সূত্র: প্রথম আলো