|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ফেসবুকে মমি বিক্রি হচ্ছে, কিনলে কী হবে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ এএম
৩৬০ পঠিত
ফেসবুকে মমি বিক্রি হচ্ছে, কিনলে কী হবে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, অনলাইনে মমির মাথা, হাত-পা এমনকি মেরুদণ্ডের অংশও বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, এসব প্রাচীন দেহাবশেষ কেনাবেচার পেছনে রয়েছে বড়সড় একটি কালোবাজার

ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে ঢুকলে কত কিছুই না চোখে পড়ে! কেউ পুরোনো ফ্রিজ বিক্রি করছেন, কেউ ব্যবহার করা সাইকেলটা। এমন সব জিনিসের ভিড়ে হঠাৎ যদি দেখো, কেউ একজন প্রাচীন মিসরের একটি মমির মাথা বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, বিশ্বাস হবে?

ভাবছ, এমন বিজ্ঞাপন আবার ফেসবুকে আসে নাকি! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, অনলাইনে মমির মাথা, হাত-পা এমনকি মেরুদণ্ডের অংশও বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, এসব প্রাচীন দেহাবশেষ কেনাবেচার পেছনে রয়েছে বড়সড় একটি কালোবাজার। আর এই বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য শুধু আইন বা নৈতিকতার প্রশ্নই নেই, আছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। কয়েক শ বছর আগের কোনো মমি ঘরে সাজিয়ে রাখার শখ শেষ পর্যন্ত ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্ট্যাফোর্ডশায়ারের একদল গবেষক সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্রের নাম ‘দ্য রিয়েল মমিজ কার্স’। বাংলা করলে ‘মমির সত্যিকারের অভিশাপ’। এটি প্রকাশিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কালচারাল পোয়েট্রি সাময়িকীতে। গবেষণায় উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাবেচার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মানুষের মমি এবং প্রাণীর সংরক্ষিত দেহাবশেষ বিক্রির একটি গোপন বাজার গড়ে উঠেছে।

গবেষকেরা ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এমন ১২৮টি বিক্রির বিজ্ঞাপন খুঁজে পেয়েছেন। এসব বিজ্ঞাপন ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও অনলাইন নিলাম প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিজ্ঞাপনে প্রাচীন মিসরের একটি মমির মাথার দাম চাওয়া হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ডলার। প্রায় ১০ বছর আগের সেই বিজ্ঞাপনে মাথাটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন মিসরীয় মমির মাথা’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ভাবতে পারো, মানুষের মাথাও একসময় অনলাইনে বিক্রির পণ্য হয়ে উঠতে পারে! কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এসব বিক্রির বিজ্ঞাপন অনেক সময় এমনভাবে দেওয়া হয়, যাতে সহজে ধরা না পড়ে। কোনো কোনো বিক্রেতা সরাসরি ‘মমি’ শব্দটি ব্যবহার না করে সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করেন। কারণ, অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মানুষের দেহাবশেষ কেনাবেচা নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিক্রেতারা নানা কৌশল নেন। এরপর সাধারণ ডাকব্যবস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এসব প্রাচীন দেহাবশেষ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কয়েক শ বছরের পুরোনো একটি মমি কিনে ঘরে রাখলে সমস্যা কোথায়? সেটি তো আর জীবিত নয়। ভয় পাওয়ার মতো কী আছে তাতে? আছে। সেই বিপদের নাম জীবাণু ও বিষাক্ত রাসায়নিক।

মিশরে ২৫০০ বছরের মমি উদ্ধার

মমির গায়ে লুকিয়ে থাকতে পারে ছত্রাক

মমি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাপড়ে মোড়ানো কোনো প্রাচীন দেহ। মিসরের পিরামিডের ভেতরে অন্ধকার কক্ষে শুয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো কোনো ফারাও। কিন্তু বাস্তবে অনলাইনে বিক্রি হওয়া মমির নমুনাগুলো সব সময় জাদুঘরের মতো পরিষ্কার ও যত্নে সংরক্ষিত থাকে না। অনেক সময় সেগুলোর গায়ে ছত্রাকের আস্তরণ, তুলার মতো দেখতে জীবাণুর বৃদ্ধি কিংবা ময়লা লেগে থাকে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক কির্স্টি স্কোয়ার্স একজন বায়োআর্কিওলজিস্ট। অর্থাৎ মানুষের প্রাচীন দেহাবশেষ ও জীববৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে যাঁরা অতীতের জীবন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন, তিনি সেই বিষয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে বিক্রির জন্য দেওয়া মমির নমুনাগুলোর অনেকগুলোতেই ছত্রাকের দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখা যায়। কোনো কোনো নমুনায় তুলোর মতো অণুজীবের বৃদ্ধিও রয়েছে।

এসব ছত্রাকের মধ্যে থাকতে পারে অ্যাসপারজিলাস নামের একধরনের ছত্রাক। এর কিছু প্রজাতি স্পোর তৈরি করে। স্পোর হলো ছত্রাকের বংশবিস্তারের একধরনের ক্ষুদ্র একক। এগুলো খুব প্রতিকূল পরিবেশেও দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। পরিবেশ অনুকূল হলে স্পোর থেকে আবার ছত্রাকের বৃদ্ধি শুরু হতে পারে।

এখানেই বিপদের বিষয়টি সামনে আসে। কোনো মমি দীর্ঘদিন শুষ্ক পরিবেশে থাকলে তার গায়ে থাকা কিছু জীবাণু বা ছত্রাকের স্পোর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সেই মমি যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো হয়, তখন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে। পরিবেশে আর্দ্রতা বাড়লে কিছু ছত্রাক আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তখন মমি নাড়াচাড়া করার সময় ছত্রাকের স্পোর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

সেগুলো শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলে শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারও ত্বকে অ্যালার্জি বা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের জন্য কিছু ছত্রাকের সংস্পর্শ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অর্থাৎ মমি কিনে ঘরের শোকেসে সাজিয়ে রাখার বিষয়টি যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা নিরাপদ না–ও হতে পারে। শুধু ক্রেতাই নন, যাঁরা এসব জিনিস প্যাকেট করেন, পরিবহন করেন কিংবা ডাকঘর ও কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করেন, তাঁরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

পিরামিডের ভেতরে পাওয়া প্রাচীন মিসরের একটা মমি

মমির গায়ে থাকতে পারে বিষও!

মমির বিপদ শুধু ছত্রাক বা জীবাণুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীনকালে মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ও খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হতো। আবার পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো দেহাবশেষ সাজিয়ে রাখার জন্যও বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়েছে।

এসবের মধ্যে থাকতে পারে সিসা, আর্সেনিক ও পারদের মতো বিষাক্ত মৌল। এগুলো শরীরে প্রবেশ করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। সিসা স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। আর্সেনিকের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পারদও স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তাই কোনো মমির গায়ে ছত্রাক দেখা না গেলেও সেটি নিরাপদ, এমন ভাবার কারণ নেই। এসব মমির ভেতরে কী ধরনের রাসায়নিক রয়েছে, তা না জেনে খালি হাতে ধরাও বিপজ্জনক।

গবেষকদের মতে, অনলাইনে বিক্রি হওয়া প্রাচীন দেহাবশেষের অনেক ক্রেতা-বিক্রেতাই এসব ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন না। বিক্রেতাদের কেউ কেউ আবার কোনো ধরনের গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই মমির অংশ হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন। সেই ছবি আবার বিক্রির বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করছেন। ফলে একজন ক্রেতা হয়তো ভাবছেন, ইতিহাসের একটি বিরল নিদর্শন সংগ্রহ করছেন। অথচ অজান্তেই নিজের ঘরে নিয়ে আসছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ বস্তু।

একসময় মমি ছিল ইউরোপের পর্যটকদের স্মারক!

মানুষের মৃতদেহ নিয়ে বাণিজ্য করার ইতিহাস নতুন নয়। কয়েক শ বছর ধরেই প্রাচীন মিসরের মমি নিয়ে ইউরোপের মানুষের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত আগ্রহ ছিল। মধ্যযুগ থেকেই ইউরোপের অনেক কৌতূহলী পর্যটক ও সংগ্রাহক মমি কেনাবেচা করতেন। তখন এসব নিদর্শনকে আজকের মতো ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়নি। বরং অনেকের কাছে এগুলো ছিল অদ্ভুত ও দুর্লভ সংগ্রহের বস্তু।

উনিশ শতকের শুরুতে প্রাচীন মিসর নিয়ে ইউরোপে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। মিসরের পিরামিড, ফারাও, সমাধি আর মমি নিয়ে একধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়। ইউরোপের ধনী মানুষদের মধ্যে মমি সংগ্রহের শখ ছড়িয়ে পড়ে। মিসর ভ্রমণে গিয়ে কেউ মমি না কিনে ফিরলে যেন তাঁর ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত!

১৮৩০ সালে ফরাসি ধর্মযাজক অ্যাবট ফার্দিনান্দ দ্য জার্মান এই অদ্ভুত প্রবণতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর কথার সারমর্ম হলো, মিসর থেকে ফিরে আসার সময় এক হাতে একটি মমি আর অন্য হাতে একটি কুমির না আনলে যেন ভ্রমণকারীর সম্মানই থাকে না!

কথাটি শুনে হাসি পেতে পারে। কিন্তু এর মধ্যেই বোঝা যায়, সে সময় মমি সংগ্রহের নেশা কতটা ছড়িয়ে পড়েছিল। মিসরের কায়রো ও লুক্সরের বাজারে তখন মমি বিক্রির জন্য বিশেষ দোকানও ছিল। কোথাও দেয়ালের পাশে কাঠের গুঁড়ির মতো স্তূপ করে রাখা হতো মমি। কোথাও আবার বিভিন্ন কফিনের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত মানুষের দেহাবশেষ। ক্রেতারা সেখান থেকে পছন্দমতো মমি কিনে নিয়ে যেতেন। তখন এসব মৃত মানুষকে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার চেয়ে বিক্রির পণ্য হিসেবেই বেশি বিবেচনা করা হতো।

পর্যটকদের সুবিধার জন্য বিক্রেতারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। পুরো মমি কিনে দেশে ফেরানো ঝামেলার মনে হলে মাথা বা হাতের মতো শরীরের আলাদা অংশ কিনে নেওয়া যেত। এতে জিনিসটি লাগেজে বহন করা সহজ হতো। অর্থাৎ প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষকে ছোট ছোট পর্যটক-স্মারকে পরিণত করা হয়েছিল।

চা-নাশতার সঙ্গে মমি খোলার আয়োজন!

মমি নিয়ে এই অদ্ভুত আগ্রহ একসময় ইউরোপের অভিজাত সমাজের ঘরেও ঢুকে পড়ে। ভিক্টোরীয় যুগে ধনী পরিবারগুলো নিজেদের আভিজাত্য ও ব্যতিক্রমী রুচি দেখানোর জন্য নানা ধরনের আয়োজন করত। এর মধ্যে ছিল মমি খোলার অনুষ্ঠান। ইংরেজিতে একে বলা হতো ‘মমি আনর‍্যাপিং পার্টি’।

এসব আয়োজনে অতিথিদের দাওয়াত দিয়ে কয়েক শ বছরের পুরোনো মমি দেখানো হতো। অতিথিদের সামনেই প্রথমবার ধীরে ধীরে উন্মোচন করা হতো মমি। অর্থাৎ মমির শরীর থেকে কাপড়ের প্যাঁচ ধীরে ধীরে খুলে দেখানো হতো।

সেই সময়ের অভিজাতদের কাছে এটি ছিল একধরনের বিনোদন। প্রাচীন মিসরের মমির গায়ে জড়ানো কাপড় স্তরে স্তরে খুলে দেখা হতো ভেতরে কী আছে। অনুষ্ঠানের শেষে কোনো কোনো আয়োজক অতিথিদের হাতে মমির শরীরের ছোট ছোট অংশ উপহার হিসেবে তুলে দিতেন। অর্থাৎ কেউ চায়ের দাওয়াত থেকে ফিরছেন মমির একটি টুকরা নিয়ে!

আজকের দিনে বিষয়টি ভয়ংকর অসম্মানজনক মনে হতে পারে। কারণ, মমি কোনো সাধারণ বস্তু নয়। সেটি একসময় জীবিত একজন মানুষের দেহ। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্মৃতি, একটি সভ্যতার ইতিহাস এবং সেই সময়ের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। কিন্তু তখন এসব বিষয় খুব বেশি গুরুত্ব পেত না।

মমির অভিশাপ কি সত্যি

মমি নিয়ে মানুষের আগ্রহের সঙ্গে ধীরে ধীরে জুড়ে যায় অভিশাপের গল্প। বলা হতে থাকে, যে ব্যক্তি ফারাওয়ের সমাধি বা মমির ঘুম ভাঙাবে, তার ওপর নেমে আসবে ভয়ংকর বিপদ। এই ধারণা আলোচিত হতে শুরু করে উনিশ শতকের শেষ দিকে গথিক কাহিনি ও ভৌতিক সাহিত্যে।

১৯২২ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার মিসরের রাজা তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কার করেন। এই খননকাজে অর্থায়ন করেছিলেন ব্রিটিশ ধনকুবের লর্ড কারনারভন। কিন্তু সমাধি আবিষ্কারের মাত্র পাঁচ মাস পর, ১৯২৩ সালে কারনারভনের মৃত্যু হয়।

তাঁর মৃত্যু হয়েছিল নিউমোনিয়া ও রক্তে সংক্রমণের কারণে। এর সূত্রপাত হয়েছিল মশার কামড়ে হওয়া একটি ক্ষত থেকে। কিন্তু সেই সময় সংবাদমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা রহস্যময় গল্প ছড়িয়ে পড়ে। বলা হতে থাকে, ফারাওয়ের সমাধিতে প্রবেশ করার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সমাধির সঙ্গে যুক্ত অন্য কারও মৃত্যু বা দুর্ভাগ্যকেও অনেকে অভিশাপের ফল বলে প্রচার করতে থাকেন।

এমনকি শার্লক হোমসের স্রষ্টা লেখক আর্থার কোনান ডয়েলও এই আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন। তিনি অতিপ্রাকৃত বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, কোনো অশুভ অতিপ্রাকৃত শক্তি কারনারভনের মৃত্যুর পেছনে দায়ী ছিল। পরে হলিউডও মমির অভিশাপের এই গল্পকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তৈরি করে।

কিন্তু মমির অভিশাপের পেছনে কি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি ছিল? বিজ্ঞানীরা অবশ্য অন্য সম্ভাবনার কথা ভেবেছেন। ২০০৩ সালে চিকিৎসাবিষয়ক ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ দুই চিকিৎসক একটি চিঠি প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা ধারণা দেন, তুতানখামেনের সমাধির ভেতরে থাকা প্রাচীন শস্যের নৈবেদ্য থেকে কারনারভন হয়তো অ্যাসপারজিলাস ফ্লাভাস (Aspergillus flavus) নামের একধরনের ছত্রাকের স্পোর শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মতে, এই ছত্রাকের কারণে তাঁর অসুস্থতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমাধি খননের অভিযানে থাকা ২৫ জন পশ্চিমা মানুষের মধ্যে কারনারভনই প্রথম অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাই অনেকের মতে, সমাধির ভেতরের ছত্রাকের চেয়ে মশার কামড়ের ক্ষতে হওয়া স্থানীয় ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণই তাঁর মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অর্থাৎ কারনারভনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। মমির অভিশাপের গল্পের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই। তবে প্রাচীন সমাধির ভেতরে জীবাণু বা ছত্রাকের উপস্থিতি যে বাস্তব বিপদ তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতা রয়েছে।

এর একটি ভয়ংকর উদাহরণ পাওয়া যায় পোল্যান্ডে। ১৯৭৩ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা দেশটির রাজা চতুর্থ ক্যাসিমির জাগিয়েলনের সমাধি খোলেন। সমাধিটি পাঁচ শতাব্দী ধরে বন্ধ ছিল। ভেতরে থাকা কাঠের কফিনও তখন পচে প্রায় গুঁড়া হয়ে গিয়েছিল। গবেষকেরা কোনো বিশেষ জীবাণু প্রতিরোধী পোশাক বা মুখোশ ছাড়াই সমাধির ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন।

পরে গবেষক দলের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭৪ সালের শেষ নাগাদ তাঁদের চারজনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী এক দশকে দলের ১২ জনের মধ্যে ১০ জন মারা যান। কিছু বিজ্ঞানী এই মৃত্যুগুলোর সঙ্গে সমাধির ভেতরে থাকা ছত্রাকের সম্ভাব্য সংযোগের কথা বলেছেন। তবে সব মৃত্যুর কারণ যে নিশ্চিতভাবে একই জীবাণু ছিল, তা বলা যায় না।

এ ঘটনার পর প্রাচীন সমাধির ভেতরে থাকা অণুজীবের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ আরও বাড়ে। কোনো জায়গা বহু শতাব্দী ধরে বন্ধ থাকলে সেখানে বিশেষ পরিবেশ তৈরি হতে পারে। সেই পরিবেশে কিছু জীবাণু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। সমাধি খোলার পর বাইরের বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে তাদের আচরণ বদলে যেতে পারে।

ফারাওরা হয়তো সত্যিই কোনো অভিশাপ দিয়ে যাননি। কিন্তু তাঁদের সমাধির ভেতরে থাকা ছত্রাক মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, এটাই বিজ্ঞানের দিক থেকে অনেক বেশি বাস্তব আশঙ্কা।

ইতিহাসের নিদর্শন, নাকি ঘরের বিপদ

নতুন গবেষণাটির লেখকদের মতে, অনলাইনে মমি ও প্রাচীন দেহাবশেষের কেনাবেচা শুধু ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি। এসব বস্তু থেকে ত্বকে র‍্যাশ, শ্বাসকষ্ট কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি হতে পারে। বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকেই এসব ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন না। তাঁরা হয়তো ভাবছেন, কয়েক শ বছরের পুরোনো একটি মমির মাথা বা হাত ঘরে সাজিয়ে রাখলে বন্ধুরা অবাক হবে। কিন্তু সেই বস্তুটির গায়ে কী ধরনের ছত্রাক রয়েছে, কী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল, কিংবা সেটি থেকে ক্ষতিকর কণা বাতাসে ছড়াতে পারে কি না, তা তাদের জানা নেই।

তাই কোনো মমি অনলাইনে বিক্রি হতে দেখলে সেটিকে সাধারণ সংগ্রহযোগ্য জিনিস ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। এগুলো মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এগুলো সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

সূত্র: প্রথম আলো