|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ফেসবুক লাইভে ‘জটিল রোগ সারানোর’ দাবি, কবিরাজ করেন অপচিকিৎসা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
৩৯৮ পঠিত
ফেসবুক লাইভে ‘জটিল রোগ সারানোর’ দাবি, কবিরাজ করেন অপচিকিৎসা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ব্লাড ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ও পিত্তথলির পাথরসহ নানা জটিল রোগ সারানোর চটকদার বিজ্ঞাপন। ফেসবুক লাইভে ওষুধ চেখে দেখানোর কৌশলে রোগীদের আকৃষ্ট করার অভিযোগ। চিকিৎসার নামে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এমনকি নাকের পলিপাসের চিকিৎসা করতে গিয়ে রাসায়নিক প্রয়োগে ক্ষত তৈরির অভিযোগও করেছেন এক রোগী। পাবনা...

ব্লাড ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ও পিত্তথলির পাথরসহ নানা জটিল রোগ সারানোর চটকদার বিজ্ঞাপন। ফেসবুক লাইভে ওষুধ চেখে দেখানোর কৌশলে রোগীদের আকৃষ্ট করার অভিযোগ। চিকিৎসার নামে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এমনকি নাকের পলিপাসের চিকিৎসা করতে গিয়ে রাসায়নিক প্রয়োগে ক্ষত তৈরির অভিযোগও করেছেন এক রোগী। পাবনার বেড়া উপজেলার মাশুমদিয়া ডিগ্রি কলেজের সামনে চেম্বার খুলে বসা মো. হালিম কবিরাজের বিরুদ্ধে উঠেছে এসব গুরুতর অভিযোগ। তবে তার চিকিৎসার স্বীকৃত যোগ্যতা, ওষুধ তৈরির অনুমোদন ও চিকিৎসাপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।

হালিম কবিরাজের ফেসবুক পেজ ও প্রচারপত্রে বাতব্যথা, কোমরব্যথা, হাঁটুব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা, হাত-পা ভাঙা, কিডনি, পিত্তথলি ও মূত্রথলির পাথর, নাকের পলিপাস, টিউমার, আঁচিল, অর্শ ও ফিস্টুলাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার দাবি করা হয়েছে। এমনকি বিনা অপারেশনে পাথর গলানো, মাত্র দুই-তিন মিনিটে হাত-পা ভাঙার চিকিৎসায় কার্যকারিতা শুরু এবং পুরুষের যৌন সমস্যার সমাধানের কথাও প্রচার করা হচ্ছে। সাপে কাটা ও কুকুরের কামড়ের রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার দাবিও রয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে প্রতিদিন বহু রোগী তার চেম্বারে আসেন। রোগীপ্রতি চিকিৎসার নামে প্রায় চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ভিজিট বাবদ ৫০০ টাকা এবং দুই থেকে তিন হাজার টাকার গাছগাছড়ার ওষুধ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।

অভিযোগ রয়েছে, নিজেই বিভিন্ন গাছগাছড়া দিয়ে ওষুধ তৈরি করে চেম্বারে বিক্রি করেন হালিম। তবে এসব ওষুধ তৈরির বৈধ অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উপাদানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় কি না, তা জানা যায়নি। চিকিৎসার পাশাপাশি তথাকথিত বিভিন্ন ধরনের অপারেশন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে হাটবাজারে হকারি করে গাছগাছড়ার ওষুধ বিক্রি করতেন হালিম। পরে মাশুমদিয়া ডিগ্রি কলেজের সামনে চেম্বার স্থাপন করে রোগী দেখা শুরু করেন। বর্তমানে ফেসবুকে ‘কবিরাজ হালিম’ পেজ এবং স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

হালিমের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি নাকের পলিপাসের চিকিৎসা নিয়ে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গাছগাছড়ার নির্যাস বা প্রলেপ ব্যবহারের কথা বলে নাকের ভেতরে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এতে নাকের ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো স্বাধীন চিকিৎসা পরীক্ষা বা রাসায়নিক বিশ্লেষণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

নাটোরের বাসিন্দা মো. জহির আলী অভিযোগ করেন, ফেসবুকে প্রচারণা দেখে প্রায় দেড় মাস আগে নাকের পলিপাসের চিকিৎসা নিতে হালিমের কাছে যান। চার হাজার টাকার চুক্তিতে চিকিৎসা নেন তিনি। জহির বলেন, প্রথমে তেমন কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু মাসখানেক পর নাকের ভেতরে ঘা হয়ে যায়।

পরে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে তিনি নাকের বাড়তি মাংস অ্যাসিড দিয়ে পোড়ানো হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন বলে দাবি জহিরের। তার ভাষ্য, এতে নাকের ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আমি চাই, আমার মতো আর কেউ যেন প্রতারিত না হন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, হালিম কবিরাজের কোনো স্বীকৃত সনদ আছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার নামে ব্যবসা করছেন তিনি। একই রোগীকে মাসের পর মাস আসতে দেখা যায়। তাহলে চিকিৎসায় রোগ সারছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। রোগী এলেই অনেক সময় ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রচার করা হয়। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় এ কার্যক্রম চলছে।

মাশুমদিয়া গ্রামের সাইদ আলী বলেন, হালিম আগে হাটবাজারে মজমা করে গাছগাছড়ার ওষুধ বিক্রি করতেন। বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে চেম্বার করে রোগী দেখছেন। মানুষ নানা রোগে ভুগে সহজে সুস্থ হওয়ার আশায় তার কাছে যাচ্ছে। চিকিৎসার নামে টাকা দিয়ে ওষুধ কিনছে। আমরা চাই, প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।

এ বিষয়ে হালিম কবিরাজের কাছে মুঠোফোনে তার কবিরাজি বা হেকিমি চিকিৎসার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না, জানতে চাওয়া হয়। তবে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে পরে চায়ের দাওয়াত দেন। তিনি বলেন, ‘কিছু লেখার দরকার নেই। ভাই আমার এখানে আসেন, বসে চা খাই আর কথা বলি।’

বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেহানা পারভীন বলেন, ‘চিকিৎসা কোনো বিশ্বাস বা অনুমানের বিষয় নয়। চিকিৎসার ভিত্তি হওয়া উচিত রোগ নির্ণয়, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ওষুধের গুণগত মান এবং রোগীর নিরাপত্তা। কিছু ভেষজ উপাদানের ঔষধি গুণ থাকলেও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কোনো কবিরাজি চিকিৎসাকে নিরাপদ ও কার্যকর বলা যায় না। এই কবিরাজের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনান্ট চাকমা বলেন, ‘এই কবিরাজের বিষয়ে আমি অবগত নই। কীভাবে আইন অমান্য করে এ ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাবনার সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘লাইসেন্স বা বৈধ অনুমোদন ছাড়া কেউ চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন না। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এ ধরনের অপচিকিৎসা ও প্রতারণা বরদাস্ত করা হবে না। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স