মেইন সমস্যা
গণমাধ্যম ডেক্স
ডাক্তার বললেন, ‘ আপনার কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা বলুন।’
আম্মা আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘সমস্যা আমার এই ছেলে। গ্যাস থাকে না বলে বাড়িতে রান্নাবান্না বেহাল। খাওয়াদাওয়ার সময় এলোমেলো হয়ে গেছে। সময়মতো খেতে না পারলে আমার প্রেশার বাড়ে। প্রেশার বাড়লে মাথা ঘোরে। মাথা ঘুরলে শরীর খারাপ লাগে। শরীর খারাপ লাগলে আমি বিছানায় পড়ে থাকি।’
ডাক্তার বললেন, ‘তার সাথে আপনার এই ছেলের সম্পর্ক কী?’
আম্মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার এই বড় ছেলেই আমার মেইন সমস্যা। তাকে ইলেকট্রিক চুলা কিনে আনতে বলেছি। কারেন্টের অবস্থাও একই রকম, যায়–আসে। তবু একটা বিকল্প রাখতে চাইলাম। ছেলে আমার “আজ যাচ্ছি, কাল যাব” করে মাস পার করে দিল। সে বাজারেও যায় না, ইলেকট্রিক চুলাও কিনে আনে না।’
ডাক্তার কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা গাম্ভীর্য নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ছেলে কেন চুলা কিনে দিচ্ছে না বলে আপনার মনে হয়?’
আম্মা বললেন, ‘আমার এই ছেলের বিশেষ এক রোগ আছে।’
ডাক্তার চোখ সরু করে বললেন, ‘কী রোগ?’
আম্মা বললেন, ‘কাল করব রোগ। তার সবকিছুতেই ব, বে, বা। ফিউচার টেনস। করব, করবে, করবা। প্রেজেন্ট টেনস বলে তার লাইফে কিছু নাই। এটাই তার রোগ।’
ডাক্তার গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকালেন।
আমি কিছু বললাম না। আম্মা বললেন, ‘ওর কোনো কাজ আজ হয় না। সব কাজ আগামীকাল হয়। আর সেই আগামীকাল কোনো দিন আসে না।’
ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে বললেন, ‘আপনি নিয়মিত খাবেন। সময়মতো খাবেন। এখান থেকে বাসায় যাওয়ার পথে চুলা কিনে নেবেন।’
তারপর ডাক্তারের কাছে গেছি আম্মার হাঁটুর ব্যথা নিয়ে। ডাক্তার আম্মার হাঁটু পরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যথা কত দিন?’
এই গল্পের শুরু আহমেদ ইশতিয়াকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে।
একটা সময়ের পর মা-বাবারা তাঁদের অবিবাহিত বড় ছেলেকে আর সহ্য করতে পারেন না। এই যেমন আমি। মা–বাবার বড় ছেলে।
আমার নাম ইশতিয়াক। বয়স এমন কিছু নয় যে আমাকে দেখে অবাক হয়ে মানুষজন বলবে, ‘এই লোকটা আজও বিয়ে করেনি!’ আবার এমনও নয় যে আফসোস করে বলবে, ‘আহা, বেচারা! সময় তো একেবারে শেষ। আর কবে বিয়ে করবে!’
কিন্তু আমার আম্মার কাছে আমি এখন জাতীয় দুর্যোগ। যতবারই আম্মাকে নিয়ে নতুন কোনো ডাক্তারের কাছে যাই, ততবারই ঝামেলা হয়। ডাক্তার গম্ভীর মুখে আম্মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মা, কী সমস্যা বলুন?’
আম্মা তখন আমার দিকে না তাকিয়েই বলতে শুরু করেন, ‘সমস্যা কোনটা রেখে কোনটা বলব? এই যে ধরেন, আমার বড় ছেলে, সে মেইন সমস্যা। তার যন্ত্রণাতেই আমার অসুখ ভালো হয় না। সে ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমায়। ওঠে বেলা বারোটায়। ঘুম থেকে উঠে মোবাইল দেখে। মোবাইল দেখতে দেখতে নাশতা ঠান্ডা করে। নাশতা ঠান্ডা করে খেয়ে বলে, “আম্মা, ডিমটা একটু গরম করলে ভালো হতো।”’
আমি বললাম, ‘আমি কাজ করি, আম্মা। অনলাইনে পেপারে কাজ করি।’
আম্মা বললেন, ‘সারা রাত কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকিস। কী কাজ করিস?’
আমি চুপ করে গেলাম। আম্মা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও নিজেও জানে না কী কাজ করে। এটাই আমার সমস্যা।’
ডাক্তার আম্মার ব্লাডপ্রেশার মাপলেন। দুই ভুরু চোখের মাঝখানে এনে বললেন, ‘প্রেশার একটু বেশি।’
আম্মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘প্রেশার তো বেশি হবেই। আমার হাই প্রেশার হয়েছে এই ছেলের জন্য। আমার এই ছেলে সব সময় আমাকে প্রেশারের ওপর রাখে।’
ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখলেন। আমি উঁকি দিয়ে দেখি ডাক্তার লিখেছেন, ‘Patient has elevated BP. Family stress significant.’
আমি বললাম, ‘ডাক্তার সাহেব, ফ্যামিলি স্ট্রেস লিখছেন কেন?’
আম্মা বললেন, ‘সত্যি কথাই লিখছেন।’
পরদিন আরেক ডাক্তারের কাছে গেলাম। এই ডাক্তারও আগের ডাক্তারের মতো গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী সমস্যা হচ্ছে আপনার?’
আম্মা বললেন, ‘সমস্যা হচ্ছে গ্যাসের।’
ডাক্তার জানতে চাইলেন, ‘কী কী খেলে আপনার পেটে গ্যাস হয়?’
আম্মা বললেন, ‘পেটের গ্যাস না বাবা, বাড়ির গ্যাস।’
ডাক্তার থমকে বললেন, ‘মানে?’
আম্মা বললেন, ‘বাসায় রান্নার গ্যাস আসে–যায়। সব সময় থাকে না। থাকলেও টিমটিম করে।’
ডাক্তার বললেন, ‘ আপনার কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা বলুন।’
আম্মা আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘সমস্যা আমার এই ছেলে। গ্যাস থাকে না বলে বাড়িতে রান্নাবান্না বেহাল। খাওয়াদাওয়ার সময় এলোমেলো হয়ে গেছে। সময়মতো খেতে না পারলে আমার প্রেশার বাড়ে। প্রেশার বাড়লে মাথা ঘোরে। মাথা ঘুরলে শরীর খারাপ লাগে। শরীর খারাপ লাগলে আমি বিছানায় পড়ে থাকি।’
ডাক্তার বললেন, ‘তার সাথে আপনার এই ছেলের সম্পর্ক কী?’
আম্মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার এই বড় ছেলেই আমার মেইন সমস্যা। তাকে ইলেকট্রিক চুলা কিনে আনতে বলেছি। কারেন্টের অবস্থাও একই রকম, যায়–আসে। তবু একটা বিকল্প রাখতে চাইলাম। ছেলে আমার “আজ যাচ্ছি, কাল যাব” করে মাস পার করে দিল। সে বাজারেও যায় না, ইলেকট্রিক চুলাও কিনে আনে না।’
ডাক্তার কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা গাম্ভীর্য নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ছেলে কেন চুলা কিনে দিচ্ছে না বলে আপনার মনে হয়?’
আম্মা বললেন, ‘আমার এই ছেলের বিশেষ এক রোগ আছে।’
ডাক্তার চোখ সরু করে বললেন, ‘কী রোগ?’
আম্মা বললেন, ‘কাল করব রোগ। তার সবকিছুতেই ব, বে, বা। ফিউচার টেনস। করব, করবে, করবা। প্রেজেন্ট টেনস বলে তার লাইফে কিছু নাই। এটাই তার রোগ।’
ডাক্তার গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকালেন।
আমি কিছু বললাম না। আম্মা বললেন, ‘ওর কোনো কাজ আজ হয় না। সব কাজ আগামীকাল হয়। আর সেই আগামীকাল কোনো দিন আসে না।’
ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে বললেন, ‘আপনি নিয়মিত খাবেন। সময়মতো খাবেন। এখান থেকে বাসায় যাওয়ার পথে চুলা কিনে নেবেন।’
তারপর ডাক্তারের কাছে গেছি আম্মার হাঁটুর ব্যথা নিয়ে। ডাক্তার আম্মার হাঁটু পরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যথা কত দিন?’
আম্মা বললেন, ‘অনেক দিন।’
ডাক্তার বললেন, ‘কত বছর?’
আম্মা একটু ভেবে বললেন, ‘আমার এই বড় ছেলের বিয়ের বয়স হওয়ার পর থেকে। এখন বলতে পারেন, তার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়া থেকে।’
ডাক্তার আমার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন। গম্ভীরমুখে আম্মার হাঁটুতে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাঁটলে ব্যথা বাড়ে?’
আম্মা বললেন, ‘হ্যাঁ।’
ডাক্তার বললেন, ‘সিঁড়ি দিয়ে উঠলে?’
আম্মা বললেন, ‘হ্যাঁ।’
ডাক্তার বললেন, ‘বেশিক্ষণ দাঁড়ালে?’
আম্মা বললেন, ‘হ্যাঁ।’
ডাক্তার বললেন, ‘তাহলে বিশ্রাম নিন। ফুল বেড রেস্ট।’
আম্মা বললেন, ‘ছেলের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেব কীভাবে!’
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনার হাঁটুর ব্যথার সঙ্গে আপনার ছেলের বিয়ের সম্পর্ক কী?’
আম্মা বললেন, ‘আমার এই বড় ছেলেই আমার মেইন সমস্যা, ডাক্তার সাহেব। আমার এই ছেলের বিয়ে হচ্ছে না। তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে আমাকে কত জায়গায় যেতে হয়েছে! আত্মীয়ের বাড়িতে যেতে হয়েছে, ঘটকের সাথে কথা বলতে যেতে হয়েছে। কারও বাসায় চা খেতে যেতে হয়েছে, কারও বাসায় আবার চা খাওয়াতে যেতে হয়েছে। এত হাঁটাহাঁটি করতে করতে আমার হাঁটু নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলের বিয়ে হয়ে গেলে আমাকে আর মেয়ে দেখতে যেতে হতো না। এত হাঁটতে হতো না। হাঁটুতে ব্যথাও হতো না।’
ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় আম্মা আবার দাঁড়ালেন। ঘুরে বললেন, ‘বাবা, একটা কথা।’
ডাক্তার মুখ তুললেন। আম্মা বললেন, ‘আমার ছেলেকে একটু বুঝিয়ে বলেন।’
ডাক্তার বললেন, ‘কী বিষয়ে?’
আম্মা বললেন, ‘তার বিয়ের বিষয়ে। তাকে বিয়ে করতে বলেন। সে বিয়ে না করলে আমার কোনো অসুখ ভালো হবে না।’
ডাক্তার আমার দিকে তাকালেন। আম্মা বললেন, ‘আমার এই বড় ছেলে আমার মেইন সমস্যা। বাকিগুলো তার উপসর্গ।’
ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়েছেন। আম্মাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে এলাম। ভাবছি, বিয়েটা এবার করেই ফেলব।
সূত্র: প্রথম আলো