|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

রেলের জমিতে ধোলাই কারখানা, ভাড়ায় মিলছে কোয়ার্টারের ছাদও

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম
৩৮৫ পঠিত
রেলের জমিতে ধোলাই কারখানা, ভাড়ায় মিলছে কোয়ার্টারের ছাদও
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
চট্টগ্রাম রেলওয়ের বহুমূল্য জমি জবরদখল করে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ নামের একটি ধোলাই কারখানার বিরুদ্ধে।রেলের জমি দখল, বিদ্যুৎ-পানি চুরি, পরিবেশদূষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশের আবাসিক এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চললেও দীর্ঘ দিনেও কোনও...

চট্টগ্রাম রেলওয়ের বহুমূল্য জমি জবরদখল করে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ নামের একটি ধোলাই কারখানার বিরুদ্ধে।রেলের জমি দখল, বিদ্যুৎ-পানি চুরি, পরিবেশদূষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশের আবাসিক এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চললেও দীর্ঘ দিনেও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণে, নেওয়াজ হোটেলের উত্তর পাশে এবং ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলের পশ্চিমে আইসফ্যাক্টরি রোডসংলগ্ন আরআর টাওয়ারের বিপরীতে জমিটির অবস্থান।

এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে স্থানীয়দের পক্ষে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের পাহাড়তলী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক বরাবর পৃথক আরেকটি আবেদন জমা দেওয়া হয়। এতে আইসফ্যাক্টরি রোডের স্টেশন কলোনির পশ্চিম পাশে রেলওয়ের প্রায় এক একর জমিতে ধোলাই কারখানা পরিচালনার কথা উল্লেখ করে পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্টাফ কোয়ার্টারের ছাদ ব্যবহার এবং রেলের বিদ্যুৎ-পানি চুরির প্রতিকার চাওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে , জমিটি বাংলাদেশ রেলওয়ের হলেও রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মাসোহারা ও যোগসাজশে মোশারফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে ওই সম্পত্তি দখল করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেন। রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের নিয়মিত নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এই অবৈধ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চলছে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানাটির রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি খোলা জায়গা ও ড্রেনে ফেলার কারণে স্টেশন কলোনির আবাসিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে। দিন-রাত কেমিকেলের উৎকট গন্ধ ও বর্জ্যের কারণে শিশু-বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ছাড়া রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ছাদ ভাড়ার বিনিময়ে কাপড় শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। 

অভিযোগ সূত্র জানা গেছে , প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ১৫৬, মাঝিরঘাট রোড, মাদারবাড়ি, চট্টগ্রাম। অথচ কারখানার কার্যক্রম চলছে আইসফ্যাক্টরি রোডের স্টেশন কলোনি এলাকায়। লাইসেন্সে উল্লেখ করা ঠিকানার সঙ্গে বাস্তব অবস্থানের এই অমিলের পেছনে বড় কোনও অনিয়ম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রেলওয়ের সংযোগ থেকে অবৈধভাবে পানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাপড় ধোলাই ও ওয়াশিংয়ের কাজে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী ডিটারজেন্ট, ক্লোরিন ব্লিচ, কাস্টিক সোডা এবং পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসব কেমিকেল ও অবৈধ সংযোগের কারণে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি কারখানাসংলগ্ন এলাকায় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও নারীদের চলাচল চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী সুমন বলে, ‘এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাপড় শুকানো হয়। মাথার ওপর কাপড় ঝুলে থাকা এবং পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে বিষয়টি অত্যন্ত অস্বস্তিকর।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এখানে রাসায়নিক মিশ্রিত কাপড়ের পানি ও কাপড় শুকানোর কারণে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। কেমিকেল ছাড়া তো এসব কাপড় পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে কারখানাটি চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামী লীগের লোকজন, আবার বিএনপির সময় বিএনপির লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ সহজে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।'

স্থানীয় এক দোকানি বলেন,'উনার বিরুদ্ধে কথা বললেই ঝামেলা হয়। উনার লোকজন আছে, উনি মাফিয়া। কেউ অভিযোগ জানালে রাতে এসে হামলা হতে পারে। আমরা দেখেও না দেখার মতো আছি।'

শিক্ষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কাপড় ধোলাই ও গার্মেন্টস ওয়াশিং কারখানায় অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে নদী-নালা ও জলাশয়ের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারখানায় ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট, ক্লোরিন ব্লিচ, কাস্টিক সোডা ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য পানি শোধন ছাড়া জলাশয়ে ফেলা হলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। এতে জলজ প্রাণী ও মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। দূষিত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব দূষণ মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। যথাযথ বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব রাসায়নিকের বিকল্প নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পাশে এমন কারখানার কার্যক্রমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সরেজমিনে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে কারখানার মালিক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ আমার প্রতিষ্ঠান। এটি রেলের জমিতে নয়, আমার খতিয়ানভুক্ত নিজস্ব জায়গায় অবস্থিত। আগে অন্য একটি ভবনের নিচে আমার কারখানা ছিল। পরে সেখান থেকে সরিয়ে বর্তমান জায়গায় কার্যক্রম শুরু করি। রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ছাদে আমরা কাপড় শুকাই। তবে কোয়ার্টারের ভেতরে প্রবেশ করি না, শুধু ছাদ ব্যবহার করি। যারা ওই কোয়ার্টারে থাকেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেই ছাদ ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছি। এ জন্য তাদের মাসিক ভাড়াও দিই। আমার কারখানার মেশিনে কাপড় শুকালে ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ছাদ ব্যবহার করি। কারখানায় ক্ষতিকর কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করি না। রেলের বিদ্যুৎ ও পানি অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগও সঠিক নয়। কারখানার আশপাশে মাদকসেবন বা বিক্রির কোনও আড্ডা রয়েছে বলেও আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন,‘স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া লিখিত আবেদনটি আমি প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছি। কারখানাটি রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে কি না, প্রতিষ্ঠানটির কোনও বৈধ ইজারা বা লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে বলা হয়েছে। এখনো সেখান থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন বা ফিডব্যাক নিতে পারিনি। রেলের জমি দখল করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যদি রেলওয়ের পক্ষ থেকে কোনও লাইসেন্স বা ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি বৈধ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। স্টাফ কোয়ার্টারের ছাদে কাপড় শুকানোর বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। সরেজমিনে যাচাই করে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।’

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স