২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে নিজের অবস্থানে পরিবর্তন আনছেন ভ্যান্স
গণমাধ্যম ডেক্স
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির পর রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সামনে না রেখে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের বাইরে নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলার প্রাথমিক ইঙ্গিত এটি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। নির্বাচনের আগে দলটির পক্ষে ভ্যান্সের দেওয়া ছয়টি বক্তব্য পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সেপ্টেম্বরে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনের পর দেওয়া এসব বক্তব্যে তিনি মূলত নিজের নীতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দলটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রভাব রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর পড়ছিল। এ পরিস্থিতিতে ভ্যান্স ট্রাম্পের প্রধান কিছু নীতি; বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসীদের বিতাড়নের বিষয়গুলো এড়িয়ে যান।
কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি ছিল পরিকল্পিত। এ বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানান, ভ্যান্স ও তার উপদেষ্টারা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। এসব বিষয়ে কর্তৃত্বের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও ছিল ভ্যান্সের। ট্রাম্প তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে এসব নীতিকে সামনে আনলেও ভ্যান্স এজেন্ডাগুলোর প্রধান প্রচারক হয়ে উঠেছেন বলে তাদের অভিমত।
রিপাবলিকানরা এখন ট্রাম্প-পরবর্তী নেতৃত্বের দিকে তাকাতে শুরু করায় ৪২ বছর বয়সী ভ্যান্সের নিজস্ব রাজনৈতিক পথ তৈরির সম্ভাবনাও সামনে আসছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এখনো কিছু বলেননি ভ্যান্স। ট্রাম্পও তাকে কিংবা অন্য কাউকে সমর্থন দেননি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ভ্যান্সকে এগিয়ে থাকা একজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নেতা মনে করেন, ট্রাম্পের সমর্থক জোটের বড় অংশ ধরে রাখার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক বিতর্ক ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে আলাদা করতে হবে ভ্যান্সকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নির্বাচনে দলের পরাজয়ের কারণ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেন ভ্যান্স। ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য দায়ী করে তিনি সংঘাত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, পররাষ্ট্র সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার কথা বলেন।
ভ্যান্সের ওই পোস্টে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। তবে হোয়াইট হাউস ও ভ্যান্সের যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এ বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাদের দাবি, পোস্টটি দেওয়ার বিষয়ে আগেই জানতেন সদ্যই সাবেক হওয়া হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বে রদবদল করেন ট্রাম্প। সুজি ওয়াইলসকে সরিয়ে তার জায়গায় স্টিফেন মিলারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পদক্ষেপকে ট্রাম্পের কঠোর নীতিগুলো আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রিপাবলিকানদের পরাজয়ে এর ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তবে যুদ্ধের সিদ্ধান্তের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন তিনি। বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ভিন্ন কিছুই করতাম না।’
ভ্যান্সের পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প আগে থেকে জানতেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। তবে ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কয়েকজন রক্ষণশীল রাজনৈতিক মিত্রও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও কংগ্রেসের সাবেক দুই স্পিকার জন বোহেনার এবং পল রায়ানের সাবেক উপদেষ্টা মাইকেল রিচির মতে, এ বক্তব্য ট্রাম্প-পরবর্তী রক্ষণশীল রাজনীতির সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভ্যান্সের অবস্থান আরও সামনে এনেছে।
রিচি বলেন, ভ্যান্সের বক্তব্য রক্ষণশীলদের মধ্যে ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কোন নীতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।
তার মতে, ‘এটিকে শুধু ট্রাম্পের থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা হিসেবে দেখা সরলীকরণ হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রভাব ও প্রচারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিতর্কের বিষয়বস্তু নির্ধারণের চেষ্টা করছেন তিনি।’
ভ্যান্সের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিরা রয়টার্সকে বুধবার ট্রাম্পের বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেদিন ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভ্যান্সের দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বুঝতে পারছেন।
তবে ২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভ্যান্স কিংবা রিপাবলিকান দলের অন্য যেকোনো প্রার্থীকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে রক্ষণশীল সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্প বড় ভূমিকা রাখলে এ চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অবশ্য ভ্যান্সের নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিও পুরোপুরি অক্ষত থাকেনি। তিনি যেসব অঙ্গরাজ্যে প্রচারে গিয়েছিলেন, সেখানেও রিপাবলিকানরা হেরেছে। তার সমর্থন পাওয়া কিছু প্রচারকৌশলও দলের ক্ষতির কারণ হয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর একটি বিজ্ঞাপন ছিল। এতে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়েছিল।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতেও ভ্যান্সের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট ছিল। বিভিন্ন সমাবেশে তিনি ভোটারদের রিপাবলিকানদের সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষমতায় গেলে দলটি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে জালিয়াতির তদন্ত করবে। এ বিষয়কে তিনি হোয়াইট হাউসের অভিবাসন নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম নিয়ে প্রায় কিছুই বলেননি। ট্রাম্পের নামও খুব কম উচ্চারণ করেছেন।
উত্তর ক্যারোলাইনায় প্রচারের শেষ দিকের এক সমাবেশে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তানরা এমন একটি দেশে পরিবার গড়ে তুলুক, যে দেশ প্রাণবন্ত, সমৃদ্ধ, স্বাধীন ও স্বচ্ছল। আমি চাই সাধারণ কিছু বিষয়। আর আমি নিজের জন্য যা চাই, আপনাদের জন্যও তা-ই চাই।’
সূত্র : রয়টার্স
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স