বিজ্ঞান প্রাণহীন বিষয় নয়, বিজ্ঞান থেকে মানবিকতা বিচ্ছিন্ন করা যায় না
টেস্ট বিশেষ প্রতিবেদক
১৯৮৯ বা ১৯৯০ সালের কথা। ১৯৮৫ সালে কার্ল সেগানের কসমস দেখে আমরা রীতিমতো অভিভূত। আমরা ঠিক এ রকম আরেকটি মাস্টারপিসের খোঁজ করছিলাম। অবশেষে পেয়ে গেলাম দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান। বই হিসেবে নয়, এটি একটি টিভি সিরিজ। একেকটি পর্ব দেখতাম আর কী উত্তেজনা নিয়েই না সেগুলো আলোচনা করতাম! কখনো কোনো পর্ব দেখা মিস হয়ে গেলে অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতাম। আমার এখনো মনে আছে, ৬ নম্বর পর্ব ‘দ্য স্ট্যারি মেসেঞ্জার’—যেটি গ্যালিলিও ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন ধারণা নিয়ে তৈরি—আমি দেখতে মিস করেছিলাম!
প্রতি শুক্রবার বা সোমবার আমরা কয়েকজন নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে বসতাম, ঢাকা থেকেও তিন-চারজন আসত। কখনো কারও বাসায় বসতাম, কখনো ৫ নম্বর ঘাটের নদীপারে হাঁটতাম, অথবা বসতাম বোস কেবিন বা ক্যাফে মোগল রেস্তোরাঁয়। সেদিন শুধু সুব্রত (পুরো নাম সুব্রত মজুমদার) এসেছিল। দুপুরে ক্যাফে মোগলে বসে গভীর মনোযোগে তার কাছ থেকে সেই পর্বের কাহিনি শুনছিলাম আর মাঝে মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। এখনো সেই স্মৃতিময় দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
পরে যখন আরও ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, দেখলাম কার্ল সেগান তাঁর দ্য ড্রাগনস অব ইডেন বইয়ের ভূমিকায় এই সিরিজের জন্য জ্যাকব ব্রোনোস্কির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তখন ব্রোনোস্কি ও অ্যাসেন্ট অব ম্যান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার তীব্রতা আমার ভেতর আরও বেড়ে গেল।
জ্যাকব ব্রোনোস্কির কালজয়ী গ্রন্থ দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান। এটি একই সঙ্গে একটি বিখ্যাত টিভি সিরিজও। তিনি একাধারে ছিলেন একজন গণিতবিদ ও জীববিজ্ঞানী।
বিজ্ঞানকে কেন্দ্র করে বিবিসির একটি মেগা-সিরিজ বানানোর আইডিয়া ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ ক্যানভাস বা ভাস্কর্যের মতো বিজ্ঞানের ধারণাগুলো তো আর দৃশ্যমান উপাদাননির্ভর ছিল না; বিজ্ঞান মূলত বিভিন্ন জটিল তত্ত্ব ও বিমূর্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিজ্ঞাননির্ভর এই মেগা-সিরিজটির জন্য ডেভিড অ্যাটেনবরো এবং অব্রি সিঙ্গার যৌথভাবে জ্যাকব ব্রোনোস্কিকে নির্বাচিত করেন। ব্রোনোস্কি শারীরিক গঠনে ছিলেন অত্যন্ত খর্বকায় মানুষ, কিন্তু তাঁর অবয়বে ছিল এক অন্য রকম শক্তিমত্তা—চোখে জ্বলজ্বল করত জ্ঞানের তীব্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আর কণ্ঠে ছিল অপরিসীম নিষ্ঠা ও গভীর ভাবাবেগ। তিনি কেবল একজন প্রথিতযশা গণিতবিদ বা বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদই ছিলেন না, বরং ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যসমালোচক এবং উইলিয়াম ব্লেকের কাব্যের একজন প্রখ্যাত গবেষক।

জ্যাকব ব্রোনোস্কির কালজয়ী গ্রন্থ দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান। এটি একই সঙ্গে একটি বিখ্যাত টিভি সিরিজও। তিনি একাধারে ছিলেন একজন গণিতবিদ ও জীববিজ্ঞানী। ব্রোনোস্কি এই সিরিজের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন, আবহমানকাল থেকে পৃথিবীর মানুষ সভ্যতার প্রয়োজনে, শিল্প-সংস্কৃতিতে বা প্রাণের প্রকাশে কীভাবে বৈজ্ঞানিক চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, সমগ্র প্রকৃতি-জগৎ কীভাবে মৌলিক যুক্তিসহ বৈজ্ঞানিক প্রবাহধারায় নিমজ্জিত থেকে স্পন্দিত হচ্ছে—এসব তুলে ধরাই ছিল এই গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্য। বই ও টিভি সিরিজ—দুটিতেই ১৩টি করে অধ্যায় ও পর্ব রয়েছে। এটি চিত্রায়িত হয়েছিল ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। ১৯৭৩ সালে সিরিজটি টিভিতে প্রচারিত হয় এবং ওই বছরই গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান সিরিজে প্রজাতি হিসেবে এবং নিজস্ব পরিবেশের কাঠামোর প্রেক্ষাপটে মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের এক দীর্ঘ পথরেখাকে ব্রোনোস্কি চমৎকারভাবে দেখিয়েছিলেন।
ব্রোনোস্কি শারীরিক গঠনে ছিলেন অত্যন্ত খর্বকায় মানুষ, কিন্তু তাঁর অবয়বে ছিল অন্য রকম শক্তিমত্তা—চোখে জ্বলজ্বল করত জ্ঞানের তীব্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আর কণ্ঠে ছিল অপরিসীম নিষ্ঠা ও গভীর ভাবাবেগ।
এটি ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানের এক অনবদ্য ইতিহাসও বটে। কীভাবে একত্রে মানব ও মানবমস্তিষ্ক বৃদ্ধি লাভ করেছিল, তারও বিশদ বর্ণনা এখানে রয়েছে। বিটিভির কল্যাণে ১৯৯০-এর দশকে আমাদের পক্ষে এই টিভি সিরিজটি দেখা সম্ভব হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর দুটো বিপর্যয়কর ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, বিজ্ঞানকে ভোগের বস্তুতে পরিণত করা হলেও তা সমাজে আত্তীকরণ করা যায়নি। ফলে মানুষের সঙ্গে কোনো সমঝোতা গড়ে ওঠেনি। এই বইটি পড়ে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন কার্ল সেগান। এর প্রেরণাতেই তিনি রচনা করেছিলেন কসমস এবং সেটিকে ১৩ পর্বের টিভি সিরিজের রূপ দিয়েছিলেন।
বইটি স্টিফেন হকিংকেও দারুণ অনুপ্রাণিত করেছিল; তিনি ভেবেছিলেন মানবজাতির চড়াই-উতরাইয়ের কষ্টকর পথের কথা। এটি গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল রজার পেনরোজকে, তিনি গভীর মগ্নতায় চিন্তা করেছিলেন তাঁর ভাবনাগুলোকে। কার্ল সেগান তাঁর দ্য ড্রাগনস অব ইডেন বইয়ের ভূমিকায় জ্যাকব ব্রোনোস্কিকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বইটি ব্রোনোস্কির স্মৃতিকে উৎসর্গ করা হয়েছে, কারণ ব্রোনোস্কি ছিলেন এমন একজন চিন্তাবিদ যিনি বিজ্ঞান, মানবতা ও সংস্কৃতিকে সফলভাবে একসঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। সেগান মনে করতেন, মানব বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন নিয়ে তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধান মূলত ব্রোনোস্কির কাজেরই ধারাবাহিকতা।
জ্যাকব ব্রোনোস্কির দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান বইটির মুখবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন তিনি এই বিশাল প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন এবং এর পেছনের দর্শনটি ঠিক কী ছিল।
বইটি মূলত মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি চমৎকার ‘জীবনী’। এখানে দেখানো হয়েছে বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ—আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে ডিএনএ বা কোয়ান্টাম ফিজিকস পর্যন্ত বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ। আছে সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশের কথা—মানুষ কীভাবে যাযাবর জীবন থেকে কৃষি ও সভ্যতার দিকে এগিয়েছে। আরও আছে স্থাপত্য ও শিল্পের বর্ণনা—পিরামিড নির্মাণ থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগের শিল্পকর্মের পেছনে যে বিজ্ঞান কাজ করেছে, তা এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সর্বোপরি এখানে এসেছে দর্শন ও নৈতিকতার কথা।
বিজ্ঞানের অপব্যবহার, যেমন পরমাণু বোমা সম্পর্কে ব্রোনোস্কি তাঁর গভীর নৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বইটি লেখার পেছনে তাঁর কিছু ব্যক্তিগত সংযোগও কাজ করেছে। কারণ ব্রোনোস্কি নিজে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাৎসিদের হাতে তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যকে হারিয়েছিলেন। আউশভিৎজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে তাঁর দেওয়া বক্তৃতাটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে তিনি অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানান।
জ্যাকব ব্রোনোস্কির দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান বইটির মুখবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন তিনি এই বিশাল প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন এবং এর পেছনের দর্শনটি ঠিক কী ছিল। বইটির মুখবন্ধের প্রধান দিকগুলোর একটি হচ্ছে বিজ্ঞানের মানবিক চেহারা। ব্রোনোস্কি মুখবন্ধে স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিজ্ঞান কোনো যান্ত্রিক বা প্রাণহীন বিষয় নয়; এটি মূলত মানুষের চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বিজ্ঞানকে মানুষের দর্শন হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের ইতিহাস মানেই মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস।
বিজ্ঞানের অপব্যবহার, যেমন পরমাণু বোমা সম্পর্কে ব্রোনোস্কি তাঁর গভীর নৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বইটি লেখার পেছনে তাঁর কিছু ব্যক্তিগত সংযোগও কাজ করেছে।
দ্বিতীয়ত, বইটির শিরোনামের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত বই দ্য ডিসেন্ট অব ম্যান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই নামটি বেছে নিয়েছেন। তবে ‘Descent’ (যা জীববৈজ্ঞানিক ক্রমবিকাশ বোঝায়) শব্দের পরিবর্তে তিনি ‘Ascent’ (আরোহণ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক যে ঊর্ধ্বগমন বা উন্নতি ঘটেছে, মূলত সেটিকেই বোঝাতে চেয়েছেন।
তৃতীয়ত, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান এবং সাহিত্য পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন, এই বইটি লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানের সঙ্গে দর্শন, শিল্প এবং ইতিহাসের একটি সেতুবন্ধ তৈরি করা। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, মানুষের প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংস্কৃতি এবং মানবিক তাড়না কাজ করেছে।
চতুর্থত, ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট ও দায়িত্ব। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে এই সিরিজটি তৈরি করা তাঁর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। তিনি নিজেকে কেবল একজন বিজ্ঞানী হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে এই কাহিনি বলতে চেয়েছেন। মুখবন্ধে তাঁর কণ্ঠস্বরে একধরনের নম্রতা এবং দায়বদ্ধতা ফুটে ওঠে—যেখানে তিনি বর্তমান প্রজন্মের কাছে মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার শপথ নেন।
পঞ্চমত, টেলিভিশনের প্রভাব। যেহেতু বইটি তাঁর বিবিসি সিরিজের ওপর ভিত্তি করে লেখা, তাই মুখবন্ধে তিনি এটিও উল্লেখ করেছেন যে কীভাবে টেলিভিশনের দৃশ্যপট আর বইয়ের শব্দের মধ্যে তিনি সামঞ্জস্য রেখেছেন। তিনি চেয়েছেন, পাঠক যেন পড়ার সময়ও সেই জীবন্ত দৃশ্যগুলো অনুভব করতে পারেন।
জ্যাকব ব্রোনোস্কির কালজয়ী বই এবং টেলিভিশন সিরিজ দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান একাধারে যেমন একটি অনবদ্য শিক্ষার মাধ্যম, তেমনি মানুষের মেধার এক অবিস্মরণীয় স্মারক।
এই গ্রন্থের ১৩টি পর্ব হলো—লোয়ার দ্যান দ্য অ্যাঞ্জেলস (দেবতা ও পশুর সমন্বয়), দ্য হারভেস্ট অব দ্য সিজনস (ঋতুদের ফসল), দ্য গ্রেইন ইন দ্য স্টোন (পাথরের ভেতরের দানা), দ্য হিডেন স্ট্রাকচার (লুকানো কাঠামো), দ্য মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ারস (গোলকীয় সংগীত), দ্য স্ট্যারি মেসেঞ্জার (নক্ষত্রের দূত), দ্য ম্যাজেস্টিক ক্লকওয়ার্ক (রাজকীয় ঘড়ির কলকবজা), দ্য ড্রাইভ ফর পাওয়ার (ক্ষমতার চালিকা শক্তি), দ্য ল্যাডার অব ক্রিয়েশন (সৃষ্টির সিঁড়ি), ওয়ার্ল্ড উইদিন ওয়ার্ল্ড (জগতের ভেতর জগৎ), নলেজ অর সারটেইনটি (জ্ঞান নাকি নিশ্চয়তা), জেনারেশন আপন জেনারেশন (বংশপরম্পরা) এবং দ্য লং চাইল্ডহুড (দীর্ঘ শৈশব)।
জ্যাকব ব্রোনোস্কি ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় জ্ঞানতাপসদের একজন, যাঁরা মানবজ্ঞানের প্রতিটি শাখাকে—তা সে কলা হোক বা বিজ্ঞান, দর্শন হোক বা মনোবিজ্ঞান—একই সূত্রে গাঁথা এবং আকর্ষণীয় বলে মনে করতেন।

তিনি নিজেকে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিচরণ করেছেন মানবশিক্ষার সমগ্র দিগন্তজুড়ে। তাঁর কালজয়ী বই এবং টেলিভিশন সিরিজ দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান একাধারে যেমন একটি অনবদ্য শিক্ষার মাধ্যম, তেমনি মানুষের মেধার এক অবিস্মরণীয় স্মারক।
ব্রোনোস্কির এই সিরিজের শেষ অধ্যায়টির নাম দ্য লং চাইল্ডহুড। এখানে তিনি মানুষের জীবনের সেই দীর্ঘ প্রসারিত সময়ের কথা বলেছেন, যখন মানবশিশুরা বড়দের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
অন্য যেকোনো প্রজাতির তুলনায় মানুষের এই শৈশবকাল অনেক দীর্ঘ। এই দীর্ঘ সময়েই শিশুদের মধ্যে জন্ম নেয় প্রচণ্ড প্লাস্টিসিটি বা শিখনে নমনীয়তা। অর্থাৎ, এই সময়েই তারা তাদের চারপাশের পরিবেশ এবং সংস্কৃতি থেকে নতুন কিছু শেখার এক অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করে।
আমরা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই নতুন কোনো আচরণগত এবং সাংস্কৃতিক পথ তৈরি করে নিতে পারি। নতুন কিছু শেখার এই ক্ষমতাই মানবজাতির বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পৃথিবীর অধিকাংশ জীবের জীবনযাত্রা পরিচালিত হয় তাদের স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে আগে থেকে গেঁথে থাকা বংশগত তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এবং মূলত সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও আমাদের অনেক আচরণ এখনো বংশগত উত্তরাধিকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবুও উন্নত মস্তিষ্কের কারণে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের এক অদ্ভুত সমঝোতা তৈরি হয়েছে। আমরা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই নতুন কোনো আচরণগত এবং সাংস্কৃতিক পথ তৈরি করে নিতে পারি। নতুন কিছু শেখার এই ক্ষমতাই মানবজাতির বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
গত কয়েক সহস্রাব্দে মানুষ তার অর্জিত জ্ঞানের ভান্ডারকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা আমাদের ধীরগতির জিনগত পরিবর্তনকেও ছাড়িয়ে গেছে। ব্রোনোস্কি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের এই দীর্ঘ শৈশব আর শেখার অদম্য আগ্রহই হলো আধুনিক সভ্যতা গড়ার আসল কারিগর।
লেখক: বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত
সূত্র: প্রথম আলো