|
| |
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

শহর কেন শুধু ঘুমানোর জায়গা হবে, পুকুর–উঠান–মাঠ ফেরানোর আহ্বান

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:১২ পিএম
২৯২ পঠিত
শহর কেন শুধু ঘুমানোর জায়গা হবে, 
পুকুর–উঠান–মাঠ ফেরানোর আহ্বান
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
আইপিডির অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলোকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর কিংবা লন্ডন–নিউইয়র্ক বানানোর চেষ্টা ছেড়ে নিজস্ব বাস্তবতায় পরিকল্পনা করতে হবে।

বহুতল ভবন উঠছে, সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভার। কিন্তু শহরে শিশুদের খেলার জায়গা কমছে, হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও উঠান। একই ভবনে পাশাপাশি থেকেও অনেকের সঙ্গে প্রতিবেশীর পরিচয় হচ্ছে না। আবাসিক এলাকা হয়ে উঠছে কেবল ঘুমানোর জায়গা। নগরায়ণের এই ধারার পরিবর্তন চেয়ে মানুষের মেলামেশা, খেলাধুলা ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর–পরিকল্পনাবিদেরা।

তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলোকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর কিংবা লন্ডন–নিউইয়র্ক বানানোর চেষ্টা ছেড়ে নিজস্ব বাস্তবতায় পরিকল্পনা করতে হবে। উন্নয়নের সাফল্য শুধু ভবনের উচ্চতা কিংবা অবকাঠামোর পরিমাণ দিয়ে মাপলে চলবে না; মানুষ সেখানে কতটা সুস্থ, নিরাপদ ও সামাজিকভাবে সংযুক্ত জীবন কাটাতে পারছে, সেটিও দেখতে হবে।

বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) ভার্চ্যুয়াল এক অনুষ্ঠানে এসব কথা উঠে আসে। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের নগরায়ণের উন্নয়ন দর্শন’।

মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এগুলো শুধু বসবাসের স্থান বা প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগ ও শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার ক্ষেত্রও ছিল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে এসব সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।’ তিনি বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।

অনুষ্ঠানে আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিকল্পনাহীন ও অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থা নগরের সামাজিক সংযোগ দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে কিছু সীমানাঘেরা আবাসন ও আবাসিক কমপ্লেক্সে শ্রেণিভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা, সীমিত জনপরিসর এবং বাইরের সমাজের সঙ্গে কম যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যেতে পারে।

অন্যদিকে খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাদের জীবন ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং ও ডিজিটাল পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে দলগত কাজ, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও বিরোধ মীমাংসার মতো সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ কমে যায়। নিরাপদ মাঠ, স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করে আইপিডি।

এই পরিস্থিতিতে ‘পুকুর–উঠান–পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ’ ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এতে পুকুর ও জলাশয় হবে পরিবেশের ভারসাম্য এবং পানি ব্যবস্থাপনার অংশ। উঠান ও উন্মুক্ত স্থান হবে মানুষের মেলামেশার ক্ষেত্র। পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় পরিচয়, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। আইপিডি বলেছে, এটি অতীতের নগরব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়; ঐতিহ্যের ইতিবাচক উপাদানগুলো আধুনিক পরিকল্পনায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব।

আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বৃদ্ধি বা বড় অবকাঠামো নির্মাণকেই নগরায়ণ বলা চলে না। প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে অর্থনৈতিক করিডরভিত্তিক উন্নয়নের পরামর্শ দেন তিনি।

বিআইপির সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন দর্শনের বদলে ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থ নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি শহরেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবাসিক এলাকা এখন কেবল ঘুমানোর জায়গা, অথচ এসব এলাকা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে প্রাণবন্ত থাকার কথা ছিল।

নগরের সংকট মোকাবিলায় পুকুর, খাল ও জলাভূমির আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আইপিডি। এসবের ব্যবস্থাপনায় পাড়া-মহল্লার মানুষকে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। নতুন আবাসনে খেলার জায়গা, হাঁটার পথ ও সামাজিক যোগাযোগের স্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরোনো এলাকায় এসব সুবিধা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হয়।

প্রতিটি ওয়ার্ডে মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি নিরূপণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহাবস্থানের সুযোগ রাখার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আলোচনায় আরও অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ উল্লাহ, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, পরিকল্পনাবিদ জিনিয়াস জান্নাত ও কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম।

সূত্র: প্রথম আলো