মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের মাহমুদা সুলতানা
গণমাধ্যম ডেক্স
মহাকাশে কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কী কী গ্যাস আছে, সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা কতটুকু—এসব জানতে হলে বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন বিশেষ ধরনের যন্ত্র। এমন উন্নত যন্ত্র তৈরির গবেষণায় কাজ করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে কাজ করছেন তিনি। ন্যানোটেকনোলজি ও সেন্সর প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতের মহাকাশ যাত্রা আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
মাহমুদা সুলতানার জন্ম পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। বাবা ছিলেন সরকারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। বাবার সঙ্গে বিভিন্ন প্রকৌশল প্রকল্পে গিয়ে যন্ত্রপাতি কীভাবে কাজ করে, তা দেখার সুযোগ হতো। এভাবেই প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান তিনি। পরে ডিগ্রি অর্জন করেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রাসায়নিক প্রকৌশলে। পাশাপাশি গণিতেও পড়াশোনা করেন। এরপর ভর্তি হন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ২০১০ সালে রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান ড. মাহমুদা। পরে ডিগ্রি অর্জন করেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রাসায়নিক প্রকৌশলে।
ড. মাহমুদার মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ তৈরিতেও পরিবারের ভূমিকা ছিল। তাঁর এক নিকটাত্মীয় ক্যালিফোর্নিয়ার নাসার অ্যামেস গবেষণাকেন্দ্রে পদার্থবিদ হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কাছ থেকে মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে নানা গল্প শুনতেন মাহমুদা। অন্যদিকে, প্রকৌশলীদের আবাসিক এলাকায় বড় হলেও আশপাশে নারী প্রকৌশলী প্রায় দেখতেই পেতেন না। একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, প্রকৌশল বুঝি পুরুষদের পেশা। তবে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে নিজের স্বপ্ন থেকে সরতে দেয়নি। বরং ধীরে ধীরে তিনি নাসায় কাজ করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
নাসায় যোগ দেওয়ার গল্পটিও বেশ মজার। পিএইচডির শেষ দিকে চাকরির খোঁজ করছিলেন মাহমুদা। এমআইটির একটি চাকরির মেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিচ্ছিলেন। সেখানেই চোখে পড়ে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বুথ। ছোটবেলার স্বপ্নের কথা মনে করে হাতে থাকা শেষ জীবনবৃত্তান্তটি সেখানেই জমা দেন। সাক্ষাৎকারের পর ২০১০ সালে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে গবেষক হিসেবে যোগ দেন তিনি।
নাসায় যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রাফিনভিত্তিক ডিটেক্টর তৈরির গবেষণায় নেতৃত্ব দেন মাহমুদা। গ্রাফিন হলো কার্বনের তৈরি অত্যন্ত পাতলা একটি পদার্থ। এর পুরুত্ব মাত্র এক পরমাণুর সমান। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে উন্নত সেন্সর ও ডিটেক্টর তৈরিতে গ্রাফিন বেশ সম্ভাবনাময়। এই উপাদান ব্যবহার করে আরও কার্যকর প্রযুক্তি তৈরির গবেষণায় কাজ করেন তিনি।
নাসায় যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রাফিনভিত্তিক ডিটেক্টর তৈরির গবেষণায় নেতৃত্ব দেন মাহমুদা। গ্রাফিন হলো কার্বনের তৈরি অত্যন্ত পাতলা একটি পদার্থ। এর পুরুত্ব মাত্র এক পরমাণুর সমান।
বর্তমানে মাহমুদা নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের প্ল্যানেটারি এনভায়রনমেন্টস ল্যাবরেটরিতে ইনস্ট্রুমেন্ট সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মাল্টিফাংশনাল ন্যানোসেন্সর প্ল্যাটফর্ম। ন্যানো শব্দটি দিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকার বোঝানো হয়। এক ন্যানোমিটার হলো এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ। এই প্রযুক্তির মূল ধারণা হলো, একই যন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের ন্যানোম্যাটেরিয়ালভিত্তিক সেন্সর ব্যবহার করা। ফলে অতি সামান্য পরিমাণ গ্যাস ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে অন্য গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশ বিশ্লেষণে এ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে।

তাঁর আরেকটি গবেষণা হলো কোয়ান্টাম ডট স্পেকট্রোমিটার। কোয়ান্টাম ডট হলো অতি ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর কণা। এসব কণার আকারের ওপর নির্ভর করে আলো শোষণ ও নির্গমনের বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো বিশ্লেষণের উন্নত যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মাহমুদার গবেষণায় এ ধরনের কণা ব্যবহার করে মহাকাশে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিমাপের উপযোগী স্পেকট্রোমিটার তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া নেপচুন ও তার উপগ্রহ ট্রাইটন অনুসন্ধানের একটি সম্ভাব্য মহাকাশ মিশন পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। স্কোপের অধীনে নেপচুন ও তার উপগ্রহ ট্রাইটন অনুসন্ধানের একটি সম্ভাব্য মহাকাশ মিশনের প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাহমুদা।
মাহমুদার গবেষণা হলো কোয়ান্টাম ডট স্পেকট্রোমিটার। কোয়ান্টাম ডট হলো অতি ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর কণা। এসব কণার আকারের ওপর নির্ভর করে আলো শোষণ ও নির্গমনের বৈশিষ্ট্য বদলে যায়।
গবেষণায় অবদানের জন্য বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন মাহমুদা সুলতানা। ২০১২ সালে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের আইএসটিডি নিউ অ্যাচিভার মেডেল, ২০১৩ সালে নাসার এজেন্সি অনার অ্যাওয়ার্ডের অধীনে আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাচিভমেন্ট মেডেল এবং ২০১৪ সালে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের জন্য গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। এরপর ২০১৭ সালে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের ইনোভেটর অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড, ২০১৮ সালে রবার্ট এইচ. গডার্ড টিম অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৯ সালে কারিগরি উৎকর্ষের জন্য রবার্ট এইচ. গডার্ড অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
২০২১ সালে পান ক্রেইগ টুলি অ্যাওয়ার্ড এবং স্পেস টেকনোলজি মিশন ডিরেক্টরেটের ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড। মাহমুদা সুলতানা ও তাঁর দল ন্যানোম্যাটেরিয়ালভিত্তিক একটি বহুমুখী ডিটেক্টর প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নের জন্য ২ মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল পেয়েছিলেন। তাঁর কয়েকটি উদ্ভাবনের পেটেন্ট রয়েছে, আরও কিছু উদ্ভাবনের পেটেন্টের আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
গবেষণার পাশাপাশি তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে আগ্রহী করে তুলতেও কাজ করেন ড. মাহমুদা। বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে চান তিনি। কারণ, ছোটবেলায় আশপাশে নারী প্রকৌশলী না দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর নিজেরও ছিল। তিনি চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা যেন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা অনুভব না করে।
সূত্র: নাসা, উইকিপিডিয়া
সূত্র: প্রথম আলো