ওরহান গাজী: ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত সূচনায় ঐতিহাসিক নাম—চতুর্থ পর্ব
গণমাধ্যম ডেক্স
তৃতীয় পর্বে উল্লিখিত হয়েছিল, ১৩৩১ সালের ২ মার্চ ওরহান নিকিয়া শহর জয় করে আত্মসমর্পণকারী রোমান গভর্নর ও তাঁর সৈন্যদের নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এ ছাড়া নিকিয়ার জনগণের মধ্যে যারা চলে যেতে চেয়েছিল, তাদেরও নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন ওরহান। যদিও কয়েকজন ছাড়া তেমন বড়সংখ্যক সাধারণ মানুষ নিকিয়া ত্যাগ করেনি। নিকিয়ার প্রায় ৩০ হাজার সাধারণ জনগণের সুবিধার্থে ওরহান কয়েক বছরের জন্য কর মওকুফ করেন। নিকিয়ার মানুষকে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনেরও অনুমতি দেওয়া হয়। দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ওরহান তৎক্ষণাৎ নিকিয়ার জনগণের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। ফলে নিকিয়ার সাধারণ মানুষেরা ওরহানের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস শুরু করে। নিকিয়া জয় করার মাধ্যমে ওরহান গাজী তুর্কিদের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে যান। এর কারণ আগে ১০৮১ সালে নিকিয়া জয় করেছিলেন মাত্র একজন সেলজুক শাসক সুলেইমান ইবনে কুতুলমিশ। তবে ১০৯৭ সালে রোমান সাম্রাজ্য নিকিয়াকে আবারও পুনর্দখল করে ফেলে। তাই পরবর্তী সময় ১৩৩১ সালে ওরহান গাজীর নিকিয়া জয় করার ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়।
নিকিয়া বিজয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে ওসমানীয় সৈন্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকেন ওরহান। ভিনদেশি বণিকদের কর ছাড়াই ব্যবসা করার অনুমতি প্রদান করা হয় বুরসা, নিকিয়া, সোগুত, ইয়েনিসেহিরসহ ওসমানীয়দের অধীন প্রায় সব শহর ও দুর্গে। করের বোঝাও কম থাকায় সাধারণ মানুষেরও উপার্জন বাড়তে থাকে। এভাবে ওরহান তাঁর বাবার মতোই সাম্রাজ্যের বেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করেন।
১৩৩৩ সালে ওসমান গাজীর দ্বিতীয় পুত্র ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রথম উজির আলাউদ্দিন পাশা মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার দরুন তাঁর মৃত্যু হয়। ওরহান গাজী তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুতে বেশ মর্মাহত হয়ে পড়েন। ওসমানীয় সাম্রাজ্যে প্রশাসনিক গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন পরিবর্তন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবামূলক কাজের প্রচলন—এ সবকিছুতেই আলাউদ্দিন পাশার বেশ বড় অবদান ছিল। তাই ওসমানীয় সাম্রাজ্য গঠনের ইতিহাসে আলাউদ্দিন পাশার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ওরহান তাঁর ভাই আলাউদ্দিনের মৃত্যুর আগে ফোদ্রা গ্রাম নামক একটি অঞ্চল তাঁর নামে লিখে দিয়েছিলেন। আলাউদ্দিন পাশা একজন গণ্যমান্য বে–এর কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন ওসমানের আমলে। তাঁর পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যাসন্তান ছিল। পরবর্তী সময়ে আলাউদ্দিন পাশার বংশধরদের ধারা ১৬ শতাব্দী পর্যন্ত বলবৎ ছিল এবং তাঁর বংশধরেরা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সেবা করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ওসমান–পুত্র আলাউদ্দিন খুবই ধার্মিক, আলেম ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। তিনি বেশ কিছু মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: ns@prothomalo.com
তা ছাড়া ওরহানের বাবা ওসমান গাজীর সেনাপতি কনুর আল্প ১৩২৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ওরহানের দাদা আরতুগ্রুল গাজীর সময়ের শতবর্ষী বিখ্যাত যোদ্ধা আবদুর রহমান গাজী ১৩২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আরতুগ্রুলের সহচর ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিখ্যাত শতবর্ষী সেনাপতি তুরগুত বে ১৩৩৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আরেক বিখ্যাত কায়ী যোদ্ধা সামসা চাভুশও ১৩৩০ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। তা ছাড়া ওসমানের চাচাতো ভাই আকতেমুর বে ও সুলেইমান বে–এর ব্যাপারেও বুরসা–জয় পরবর্তী সময়ের তেমন একটা ইতিহাস নেই বললেই চলে। তাই বলা যায়, ওরহান তাঁর বাবার আমলের বিখ্যাত সেনাপতি ও যোদ্ধাদের সিংহাসনে বসার কয়েক বছরের মধ্যেই একে একে হারিয়ে ফেলেছিলেন।

ওরহান বে ১৩৩৩ সালে তৎকালীন আনাতোলিয়ার বিথিনিয়ায় একমাত্র অবশিষ্ট রোমান শহর নিকোমিডিয়া অবরোধ শুরু করেন। নিকোমিডিয়ার আশপাশে প্রায় আট হাজার ওসমানীয় সৈন্য অবরোধ গড়ে তুললে রোমান সম্রাট আবারও বিপাকে পড়ে যান। কিছুদিন পর রোমান সম্রাট তৃতীয় আন্দ্রেনিকোস ওরহান গাজীর কাছে দূত পাঠিয়ে অবরোধ বন্ধ করতে বলেন এবং এর বিনিময়ে রোমান সাম্রাজ্য থেকে ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে বার্ষিক কর প্রদান করার প্রস্তাব দেন। ওরহান উক্ত প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। দেখতে দেখতে চার বছর চলে যায়। তীব্র অবরোধে নিকোমিডিয়ার রোমান সৈন্য ও সাধারণ জনগণ খাদ্যসংকটের মুখে পড়ে। দুর্ভিক্ষ আসন্ন দেখে শহরের রোমান গভর্নর সাহায্য চান সম্রাটের কাছে। কিন্তু রোমান সম্রাট নিকোমিডিয়ার ব্যাপারে কোনো পাত্তা না দিয়েই আলবেনিয়া অভিযানে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। শহরের সাধারণ জনগণ ও সৈন্যদের অবস্থা বেগতিক দেখে অসহায় রোমান গভর্নর ১৩৩৭ সালেই আত্মসমর্পণ করেন। ফলে রোমান শহর নিকোমিডিয়ার পতন হয়ে যায়। ওরহান সেই রোমান গভর্নর ও তাঁর হাজারখানেক সৈন্যকে নিরাপদে শহর ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দেন। পাশাপাশি বেশ কিছু সাধারণ মানুষও স্বেচ্ছায় শহর ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপল চলে যাওয়ার অনুমতি পান।

ওরহান নিকোমিডিয়ায়ও বিজয়ের পর তাঁর বাবার মতো উদারতা দেখান। সাধারণ মানুষের করের বোঝা কয়েক বছরের জন্য মওকুফ করে তাদের স্বাধীনভাবে বসবাসের অনুমতি দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিকোমিডিয়ার প্রায় ২০ হাজার জনগণ নিশ্চিন্তে ব্যবসা, ধর্ম পালনসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে শান্তিতে বসবাস শুরু করে। ফলস্বরূপ কয়েক বছরের মধ্যেই নিকোমিডিয়ার বেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়। আর নিকোমিডিয়া জয়ের মধ্য দিয়ে আনাতোলিয়ার বিথিনিয়া অঞ্চল থেকে রোমান সাম্রাজ্যের শেষ অংশটুকু মুছে ফেলা হয়। তখন ওসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের মধ্যে সীমানায় ছিল কেবল বসফরাস প্রণালি। যার ফলশ্রুতিতে ওরহান বিথিনিয়া অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আনাতোলিয়ার এশিয়া মাইনরে রোমান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে ফেলেন। চলবে...
*লেখক: তাওহীদ জানান অভিক, শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: প্রথম আলো