দুবার নোবেলজয়ী বিরল বিজ্ঞানী তিনি, কেন তাঁকে সিসার তৈরি বদ্ধ কফিনে সমাহিত করা হলো
গণমাধ্যম ডেক্স
মেরি কুরি—নামটার সঙ্গে অনেকগুলো ‘প্রথম’ জড়িয়ে আছে। তিনি প্রথম নারী নোবেলজয়ী। প্রথম দুটি নোবেল জয়ের রেকর্ড তাঁর ঝুলিতে। দুটি ভিন্ন বিষয়ে প্রথম নোবেল জেতেন তিনি। পোল্যান্ডের ওয়ারশতে ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর তাঁর জন্ম। তবে জীবনের বেশির ভাগ কেটেছে ফ্রান্সে। আজ মেরি কুরির জন্মদিন। দিনটি উপলক্ষে জগৎখ্যাত বিজ্ঞানীকে স্মরণ করে এ লেখা।
গল্পটা এমন এক সময়ের, যখন ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের জয়জয়কার ঘটে গেছে। তারও আগে রেঁনেসার স্বর্ণালি সময় পেরিয়ে আধুনিক ইউরোপের যাত্রা শুরু হয়েছে। সমাজ, অর্থনীতি, সভ্যতা দুর্দান্ত গতিতে ছুটছে। তবে নারীদের অবস্থা তখনো অনেকটাই তথৈবচ। ইউরোপের অনেক দেশে শিক্ষা-দীক্ষায় বেশ পিছিয়ে নারীরা। বিজ্ঞান গবেষণায় নারীর অংশগ্রহণ, প্রায় অকল্পনীয়।
এমন একটা সমাজে, এমন একটা সময়ে সীমারেখার গণ্ডি ভেঙেছিলেন মেরি কুরি। বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। গবেষণায় মত্ত ছিলেন। আবিষ্কারে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। ফলাফল, প্রথম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার অর্জন। শুধু কি তাই, একবার নয়; দুবার সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
মাদাম মেরি কুরিকে শুধু নোবেলজয়ী বললে কম বলা হবে। বিজ্ঞানের পৃথক দুটি শাখায় দুবার নোবেল জয়ের রেকর্ড বিশ্বের আর কোনো মানুষের নেই। যেখানে নারী হিসেবে পড়াশোনা করাটাই কার্যত অসম্ভব ছিল, সেখানে বিজ্ঞানের মতো কঠিনতর বিষয়ে পড়াশোনা, গবেষণা ও আবিষ্কার মেরি কুরিকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান গবেষণার এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় মেরি কুরিকে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এসেছে তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে।
অনটনের সংসারে মেধাবী মেয়ে
সময়টা ১৮৬৭ সাল। পোল্যান্ড তখন রুশ সাম্রাজ্যের অংশ। ওয়ারশতে ৭ নভেম্বর জন্ম নেন মেরি কুরি। তখন নাম ছিল মারিয়া সালোমিয়া স্ক্লোদোভস্কা। বাবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা পড়াতেন।
শৈশব থেকে পড়াশোনার প্রতি ভীষণ টান মারিয়ার। বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতি। ওয়ারশর একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু। বেশ ভালো ছাত্রী। বাবার কাছে বিজ্ঞানের মৌলিক কিছু বিষয়ের পাঠ নেন। ১৬ বছর বয়সে মারিয়ার মাধ্যমিকের পাঠ শেষ হয়। স্বর্ণপদক পান।
তেজস্ক্রিয় পদার্থের অবশিষ্টাংশ থেকে রেডিয়াম আলাদা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন মেরি কুরি। এর ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেডিয়াম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। পরে এ মৌলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন তিনি। বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে রেডিয়ামের ব্যবহার নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল।
তত দিনে ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করে সব সঞ্চয় ও সম্পত্তি খোয়ান মারিয়ার বাবা। টানাটানির সংসারের তীব্র অনটন দেখা দেয়। এ অবস্থায় মারিয়ার পড়াশোনা বন্ধের জোগাড়। উপায় না দেখে অল্প বয়সে তাঁকে গৃহশিক্ষিকার পেশায় যুক্ত হতে হয়। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আর সংসারের হাল ধরতে এটা ছাড়া উপায়ও ছিল না।
ওই সময়ে পোল্যান্ডে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতেন না। মারিয়ার বড় বোন ব্রোনিয়া ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়তে যান। বাবার অপরাগতায় বোনের পড়াশোনার অর্থ জোগান মারিয়া। আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে বোন কাজে ঢুকবে। তখন তিনি মারিয়ার পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারবেন।
এর মধ্যেই শিক্ষার্থীদের একটি বিপ্লবী সংগঠনে জড়িয়ে পড়েন মারিয়া। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ওয়ারশ ছেড়ে পোল্যান্ডের আরেকটি শহর ক্রাকোতে চলে যাওয়ার কথা ভাবেন। ওয়ারশ ছিল রুশ নিয়ন্ত্রিত। ক্রাকো অস্ট্রিয়ার অধীন। তবে ভাগ্যের লিখন আর কে খণ্ডাতে পারে। ভাগ্য মারিয়াকে নিয়ে যায় প্যারিসে।
প্যারিসে পাড়ি জমানো, বিয়ে
১৮৯১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে বোনের কাছে পাড়ি জমান মারিয়া। ভর্তি হন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর নাম হয় ‘মেরি’। ১৮৯৩ সালে মেরি পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর গণিতশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তবে তৃতীয় শ্রেণিতে।
সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় মেরির জীবন বদলে দিয়েছে। সেখানেই দেখা হয় পিয়েরে কুরির সঙ্গে। পিয়েরে তখন সরবোনের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, খ্যাতিমান বিজ্ঞানী। ১৮৯৪ সালে পরিচয়, পরের বছর (১৮৯৫ সালের ২৫ জুলাই) বিয়ে করেন তাঁরা। মেরির নামে ‘কুরি’ যুক্ত হয়। নতুন নাম মেরি কুরি।
১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে অঁরি বেকেরেলের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরি। প্রথম নোবেল জয়ের আট বছর পর আসে আরেকটি বড় সুসংবাদ। ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার পান মেরি কুরি। এবার রসায়নে, এককভাবে। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয়ের পর মেরির জীবনের পরিকল্পনা বদলে যায়। তখন পিয়েরে ছিলেন স্বীকৃত বিজ্ঞানী। পরিচয়ের আগে পড়াশোনা শেষ করে পোল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল মেরির। কিন্তু বিয়ের পর পরিকল্পনা বদলাতে হয়। ফ্রান্সে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে গবেষণা কাজ শুরু করেন।
গবেষণাগারে কেটে যেত পিয়েরে-মেরির দিনের বেশির ভাগ সময়। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিরলস কাজ করেছেন দুজনে। পিয়েরে ছিলেন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের প্রধান। পরবর্তী সময়ে মেরিও সেই পদে বসেন।
স্বামীর সঙ্গে মেরির প্রথম দিকের গবেষণার কাজ খুব একটা সহজ ছিল না। গবেষণাগারের পরিবেশ ছিল অনুন্নত। জীবিকা নির্বাহের জন্য দুজনকে অনেকটা সময় শিক্ষকতা করতে হয়েছে। এ দম্পতির দুই মেয়ে, ইরেন ও ইভ।
তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা
এর আগেই ১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেছেন। তাঁর এ আবিষ্কার কুরি দম্পতিকে নতুন গবেষণায় অনুপ্রাণিত করে। দুজনের নিরলস গবেষণা ও বিশ্লেষণে আবিষ্কৃত হয় দুটি নতুন মৌল-পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম।
১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে পিয়েরে ও মেরি দম্পতি আবিষ্কার করেন পোলোনিয়াম। এর নাম রাখা হয় মেরির জন্মভূমি পোল্যান্ডের নামে। একই বছর তাঁরা রেডিয়ামও আবিষ্কার করেন। এ মৌল বিখ্যাত হয় তীব্র তেজস্ক্রিয়তার কারণে।
তেজস্ক্রিয় পদার্থের অবশিষ্টাংশ থেকে রেডিয়াম আলাদা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন মেরি কুরি। এর ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেডিয়াম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। পরে এ মৌলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন তিনি। বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে রেডিয়ামের ব্যবহার নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল।
দুইবার নোবেল জয়
১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে অঁরি বেকেরেলের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরি। পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক তাঁরা দুজন পান। বাকি অর্ধেক পান অঁরি বেকেরেল।
একই বছর স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে ফ্রান্সের রয়্যাল সোসাইটির সম্মানজনক ডেভি পদকও জিতে নেন মেরি কুরি। ১৯০৩ সালেই তিনি অর্জন করেন পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি।
প্রথম নোবেল জয়ের আট বছর পর আসে আরেকটি বড় সুসংবাদ। ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার পান মেরি কুরি। এবার রসায়নে, এককভাবে। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
আগেই বলেছি, মেরি কুরি বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিজ্ঞানের দুটি পৃথক শাখায় দুইবার নোবেল পুরস্কার জিতেছেন।

পিয়েরের মৃত্যু, মেরির কাজ
১৯০৬ সালে ঘোড়ায় টানা গাড়ির ধাক্কায় পিয়েরে কুরির মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে স্বামীর স্থলাভিষিক্ত হন মেরি কুরি। এ পদে নিয়োগ পাওয়া প্রথম নারী ছিলেন তিনি।
এ দায়িত্বে থেকে ১৯০৯ সালে রেডিয়াম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তদারক করেন মেরি কুরি। বিশ্বখ্যাত পাস্তুর ইনস্টিটিউট ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এটির কাজ শুরু হয়। ফ্রান্সে তেজস্ক্রিয়তা আর চিকিৎসাক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণার জন্য একটি বিশেষ কেন্দ্র গড়ে তোলা ছিল এর উদ্দেশ্য।
ইনস্টিটিউটটে দুটি গবেষণাগার ছিল। একটির দায়িত্বে ছিলেন মেরি কুরি। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন নিয়ে গবেষণা হতো। অন্যটি ছিল পাস্তুর গবেষণাগার। এর প্রধান ছিলেন চিকিৎসক ক্লদিয়াস রেগো। সেখানে বিকিরণের জৈবিক ও চিকিৎসাগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা হতো।
১৯১৪ সালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিয়াম ইনস্টিটিউট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এর আওতাধীন কুরি গবেষণাগারের পরিচালক হন মেরি কুরি।
এ ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাতে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কুরি ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি জনকল্যাণমূলক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর অর্থায়নে ১৯২২ সালে প্যারিসে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করা হয়। সেখানে রেডিওথেরাপিসহ ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। এ প্রতিষ্ঠান এবং এর কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে কুরি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।
মানুষের কষ্ট লাঘবে রেডিয়ামের ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মেরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মেয়ে ইরেনের সহযোগিতায় তিনি চিকিৎসাসেবার কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয়তার ব্যবহারে ভূমিকা রাখেন।
ওই সময় রেডক্রসের হাসপাতালগুলোয় এক্স-রে যন্ত্রপাতি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন মেরি কুরি। এতে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। নিজ উদ্যোগে ১৮টি গাড়িতে এক্স-রে যন্ত্র বসান। তাঁর মেয়ে ইভ গাড়িগুলোর নাম দেন ‘লিটল কুরি’। এর ফলে যুদ্ধাহত সেনাদের শরীরে আটকে থাকা গোলা ও বোমার টুকরা এক্স-রের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অস্ত্রোপচার করাও সহজ হয়।
বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ছড়ায়
মেরি কুরি ছিলেন শান্ত, বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ মানুষ। বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের। ১৯২১ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান তিনি। মূল্যবান রেডিয়াম সংগ্রহ করাই ছিল তাঁর এ সফরের উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগৃহীত অনুদানের অর্থে গবেষণার জন্য রেডিয়াম কেনা হয়।
১৯২২ সাল থেকে মেরি কুরি যুক্ত হন লিগ অব নেশনসের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা কমিশনে। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ও কর্মসূত্রে ফ্রান্সে বসবাস করা মেরি কুরি বুঝেছিলেন, গবেষণার কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকা উচিত নয়। এমন চিন্তা থেকেই তাঁর কমিশনে যোগ দেওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবী আর বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এ কমিশন।
মেরি কুরি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বে এতটাই বিশ্বাসী ছিলেন, তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনকে লিগ অব নেশনসের এ কমিশনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। ১৯২২ সালে ফ্রান্সের চিকিৎসাবিজ্ঞান একাডেমির প্রথম নারী সদস্য হন মেরি কুরি।
বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে মেরি কুরির অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বইও লিখেছেন। বিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা আর আইনশাস্ত্রে একাধিক সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন।
বিজ্ঞান নিয়ে মেরি কুরির আগ্রহ কখনোই কমেনি। নিজের জন্মশহর ওয়ারশতে একটি তেজস্ক্রিয়তা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাঁকে ৫০ হাজার ডলার উপহার দেন। ওয়ারশর গবেষণাগারের জন্য রেডিয়াম কিনতে সেই অর্থ ব্যয় করেন মেরি কুরি।
মেরি কুরি সারা জীবন বিজ্ঞানচর্চা এবং এর প্রসারে কাজ করেছেন। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষের জীবনকে সহজ করে এবং দুর্ভোগ কমিয়ে যে অগ্রগতি আনে, বিজ্ঞান হলো তার ভিত্তি।’
শেষ জীবনের কষ্ট
জীবনভর তেজস্ত্রিয়তা নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেছেন মেরি কুরি। গবেষণার সময় তিনি সম্ভবত এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তেমন একটা ভাবেননি। পকেটে বোতলভর্তি পোলনিয়াম কিংবা রেডিয়াম নিয়ে নির্দ্বিধায় নিজের গবেষণাগারে ঘুরে বেড়াতেন।
তেজস্ক্রিয় মৌল নিয়ে কাজ করার সময় যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় মেরির স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ১৯২০-এর দশকে তাঁর শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। পরে তাঁর ‘অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ নামে রোগ ধরা পড়ে। এটি ভিটামিন বি১২-এর অভাবে হওয়া একধরনের গুরুতর রক্তস্বল্পতা। এ রোগে অস্থিমজ্জা রক্তকোষ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
রোগে ভুগে মেরি কুরির জীবনের শেষ সময়টা কাটে ফ্রান্সেই। ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ফ্রান্সের সাভোয়া অঞ্চলে তাঁর মৃত্যু হয়। তখন মেরি কুরির বয়স ছিল ৬৬ বছর।
তেজস্ক্রিয়তার ভয় এখনো
মৃত্যুর পর তেজস্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে মেরি কুরিকে সিসার তৈরি বদ্ধ কফিনে সমাহিত করা হয়। ১৯৯৫ সালে প্যারিসের প্যানথিওনে এনে নতুন করে সমাহিত করা হয় তাঁর দেহভস্ম। নিজ কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্যানথিওনে সমাহিত হওয়া প্রথম নারীও তিনি। সেখানে তিনি স্বামী পিয়েরে কুরির সঙ্গে শায়িত আছেন।
মেরি কুরির মৃত্যুর ৯০ বছর পেরিয়ে গেছে। এত দিন পরেও তাঁর পোশাক, আসবাব, বই থেকে শুরু করে গবেষণাগারের বিভিন্ন সরঞ্জামে তেজস্ক্রিয়তার উপাদান সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। তাই, মেরি কুরির গবেষণাগারের নোটবুকসহ বিভিন্ন পণ্য ফ্রান্সের প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশনালে সিসা-আবৃত বাক্সে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাঁর দপ্তর ও গবেষণাগার এখন ‘কুরি জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিত।
মেরি ও পিয়েরে কুরি ১৯০৩ সালে যখন নোবেল পান, তাঁদের মেয়ে ইরেনের বয়স তখন ছয় বছর। ইরেন বড় হয়ে মা-বাবার পথেই হেঁটেছেন। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য স্বামী ফ্রেডরিক জোলিও কুরির সঙ্গে ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পেয়েছেন ইরেন।
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় জীবন পার
মেরি কুরি সম্পর্কে আরেক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র মাদাম কুরি এমন একজন, যাঁকে খ্যাতি কখনোই কলুষিত করতে পারেনি।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বহুমাত্রিক অবদান রেখে গেছেন মেরি কুরি। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের অগ্রগতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং সেই অগ্রগতির সুফল যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত কুরি ইনস্টিটিউট এখনো কাজের পথ দেখায়।
মেরি কুরি মনে করতেন, জ্ঞানচর্চার সুযোগ শুধু সমাজের বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং সমাজের সব মানুষের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘উচ্চশিক্ষার পথ ধনী পরিবারের সন্তানদের জন্য অনেকটাই উন্মুক্ত। কিন্তু স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য তা এখনো কঠিন। এর ফলে প্রতিবছর প্রতিটি দেশ তাদের সবচেয়ে মেধাবী ও মূল্যবান প্রতিভার একটি বড় অংশ হারাচ্ছে।’
মেরি কুরির মতে, ‘কী করা হয়েছে, তা কেউ খেয়াল করে না; বরং কী করা বাকি আছে, সেটাই সবার চোখে পড়ে।’ তাঁর কাছে প্রতিটি আবিষ্কার ছিল নতুন কোনো আবিষ্কারের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। গবেষণার কোনো শেষ নেই—এ বিশ্বাস থেকেই বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তিনি।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নোবেল প্রাইজ, আমেরিকান নিউক্লিয়ার সোসাইটি, কুরি ইনস্টিটিউট ও ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ওয়েবসাইট এবং ব্রিটানিকা।
সূত্র: প্রথম আলো