ঘটনার বর্ণনা দিলেন মোটরসাইকেলের চালক
গণমাধ্যম ডেক্স
মোটরসাইকেলটিতে বসা চালক মো. ফারুক মিয়া ও যাত্রী এ বি এম আহসানুল্লাহ আরিফ। অপেক্ষা সিগন্যালে সবুজ বাতি জ্বলার।
চালক ফারুক মিয়া শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যখন সিগন্যালে, তখন পেছন থেকে রাস্তার মাঝ দিয়ে এগিয়ে আসে বড় একটি ক্রেন। ক্রেনটি মোটরসাইকেলের ওপরে উঠে যায়। ক্রেনের একটি অংশ গিয়ে পড়ে মোটরসাইকেলের যাত্রী আরিফের শরীরের ওপর।’
ফারুক মিয়া আরও বলছিলেন, তিনি কোনোভাবে বেঁচে যান। গুরুতর আহত হন আরিফ। তাঁর কোমরের নিচ থেকে দুই পায়ের মাংস উপড়ে যায়। ডান পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ থেঁতলে যায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থেকে মারা যান আহসানুল্লাহ আরিফ, যিনি পেশায় প্রকৌশলী ছিলেন।
দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ অক্টোবর রাজধানীর এফডিসি মোড়ে। ক্রেনটি হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্ক–সংলগ্ন এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
দুর্ঘটনাটি খুব একটা আলোচনায় আসেনি। আহসানুল্লাহ আরিফের স্বজনেরা বলছেন, তাঁকে হারিয়ে তাঁর পরিবার এলোমেলো হয়ে গেছে।
দেশের যেসব অবকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়েছে, তার একটি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ির কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই উড়ালসড়কের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৯ সালে। আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি।
২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার অংশের উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ করছে চীনের শানডং হাইস্পিড গ্রুপ ও শিনোহাইড্রো করপোরেশন।
ক্রেনচাপা পড়ে প্রকৌশলী আহসানুল্লাহ আরিফের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম আলোর কাছে বর্ণনা করেছেন মোটরসাইকেলচালক ফারুক মিয়া এবং আরিফের বড় ভাই এ বি এম ইয়াসিন উল্লাহ। তাঁরা জানান, দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ক্রেনের চালককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
ইয়াসিন উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি থাকা বৃদ্ধ মাকে দেখতে যাচ্ছিলেন আরিফ। দুর্ঘটনার পর মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু আরিফ আর ফিরতে পারেননি।
দুর্ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর আরিফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে উল্লেখ করে ইয়াসিন উল্লাহ বলেন, সেখানে অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা তাঁর ডান পা কেটে ফেলেন। বাঁ পায়ের বেশির ভাগ অংশের মাংস উপড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা পা বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। দুর্ঘটনার দিন থেকেই তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। ২৩ অক্টোবর গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরিফ।
আরিফের পরিবার জানিয়েছে, তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে। বড় ভাই ইয়াসিন উল্লাহ বলেন, মা এখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না। আরিফের স্ত্রী দিশাহারা। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার তরতাজা ভাইটা চলে গেল। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। পুরো পরিবারটা এলোমেলো হয়ে গেছে।’
ইয়াসিন উল্লাহ জানান, তিনি বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের এক কর্মকর্তা। আরিফ ছিলেন প্রকৌশলী।
আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছে তাঁর পরিবার। তবে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে একটি মোটরসাইকেল ও ক্রেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রেনটির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গেও কথা হচ্ছে।
তবে দুর্ঘটনার সময় কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ওই এলাকায় কোনো সচল সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। এর আগে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ করছে চীনের শানডং হাইস্পিড গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুর্ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানি দুটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁরা ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক গোলাম মর্তুজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সম্প্রতি জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে ইনভেস্টর কোম্পানিকে একটি তদন্ত জমা দিতে বলা হয়েছে।’
মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে ক্রেন ওপরে তুলে দেওয়ার যে অভিযোগ ভুক্তোভুগী পরিবার করছে, সে প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়নি। তবে আমরা জানতে পেরেছি, মগবাজার সিগন্যাল থেকে একটি সিএনজির (অটোরিকশা) সঙ্গে মোটরসাইকেল প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে পেছনে থাকা যাত্রী ছিটকে পড়ে। পরে ক্রেনের নিচে চলে যায়।’
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার আরও উদাহরণ আছে। ২০২৩ সালে মহাখালীতে লোহার রড পড়ে ১২ বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারায়। ২০২৪ সালে তেজকুনীপাড়ায় ক্রেন থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের কনটেইনারে চাপা পড়ে মারা যান শামীম মিয়া।
আরিফের ভাই ইয়াসিন উল্লাহ বলেন, তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচার চান। একই সঙ্গে এ ধরনের দুর্ঘটনায় আর কারও প্রাণহানি যেন না ঘটে, সেটা চান।
সূত্র: প্রথম আলো