|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

রান্নার গ্যাস ৩০০-৪৪০ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে হচ্ছে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০৯ এএম
২৫৫ পঠিত
রান্নার গ্যাস ৩০০-৪৪০ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে হচ্ছে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বাড়তি দামে বিক্রি ঠেকাতে পারছে না সরকার। বিইআরসি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়িয়েছে। তবু মানা হচ্ছে না নির্ধারিত দাম।
  • রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার।

  • বিইআরসি ২ নভেম্বর এই সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে ২,০৬০ টাকা।

  • কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২,৩০০–২৫০০ টাকা পর্যন্ত।

এলপিজির দাম নির্ধারণের সময় আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা—সবার কমিশন বাড়ানো হয়েছে। এরপরও নির্ধারিত দামে রান্নার গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা। ঢাকার বাজারে কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে অন্তত ৩০০ টাকা বাড়তি দামে। কোথাও বাড়তি দিতে হচ্ছে ৪৪০ টাকা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বাজারেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২ নভেম্বর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ২ হাজার ৬০ টাকা। রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। গতকাল শনিবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ১৫টি এলপিজি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ৪৫ কেজির সিলিন্ডারেও বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।

নতুন দাম নির্ধারণের সময় ১২ কেজির সিলিন্ডার আমদানিকারকদের মজুত ও বোতলজাত করার খরচ বাবদ কমিশন প্রায় ৮২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশকের কমিশন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে। পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, এই কমিশনে তাঁদের খরচ উঠছে না।

বাড়তি দামের বিষয়ে শীর্ষ আমদানিকারকদের দুটি প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা এলপিজির সরবরাহ বাড়িয়েছে; বাড়তি দাম নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে পরিবেশকদের অভিযোগ, সরবরাহে ঘাটতি আছে এবং কোনো কোনো কোম্পানিও বাড়তি দাম নিচ্ছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ আছে, এটা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। শিল্পে এলপিজির ব্যবহার কতটা বেড়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। কমিশনের দুজন সদস্য মাঠপর্যায়ে যাচ্ছেন। যারা আমদানি না করে অন্যদের থেকে কিনছে, তারাই মূলত বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে। এটা নিয়েও কাজ করছে বিইআরসি।

আমদানি বাড়েনি, সরবরাহ ঘাটতি

গ্যাসের চুলা বন্ধ। এলপিজির দাম বেশি। তাই রান্না হচ্ছে লাকড়ির চুলায়। ধানমন্ডি এলাকায়

দেশে এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। বাসায় গ্যাস–সংযোগ বন্ধ থাকায় ২০১৫ সাল থেকে দেশে এলপিজির চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। বছরে এলপিজির চাহিদা এখন ১৮ লাখ টনের বেশি। এ খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের দখলে, যারা আমদানি করে সরবরাহ করে। আর বাকি ১ শতাংশ দেশে উৎপাদন করে সরবরাহ করে সরকারি কোম্পানি।

এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও বিইআরসি সূত্র বলছে, গত আগস্টে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং অক্টোবরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার টনের কম। যদিও এরপর ৪ নভেম্বরের মধ্যেই আরও ৪০ হাজার ২০০ টন এলপিজি দেশে এসেছে। বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি না করতে বিভিন্ন সময় পরিবেশকদের সতর্ক করেছে লোয়াব।

আমদানিকারকদের কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি আছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বন্ধ বললেই চলে। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নামমাত্র পাওয়া যাচ্ছে। এখন দেশে অধিকাংশ এলপিজি আমদানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা প্রথম আলোকে বলেন, মেঘনার ৪টি প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় এলপিজি সরবরাহ করে হচ্ছে। যারা আমদানি করতে পারছে না, তাদেরও সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা উচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো উচিত বাজারে।

আমদানিকারকদের কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি আছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বন্ধ বললেই চলে। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নামমাত্র পাওয়া যাচ্ছে। এখন দেশে অধিকাংশ এলপিজি আমদানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনতে জাহাজ ভাড়াতেও বেশি খরচ হচ্ছে। দেশে খুব বেশি মজুত করে রাখার মতো অবকাঠামোও নেই। আবার মজুত করার পর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ থেমে গেলে বড় রকমের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।

লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দামের চেয়ে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়তি দামে আমদানি করেও বিইআরসির নির্ধারিত দামে সরবরাহ করা হচ্ছে। এলপিজির দাম বাড়লে ভোক্তা কমবে, যা অপারেটররা চান না। তবে যত্রতত্র দোকানে যে যার মতো এলপিজি বিক্রি করছে। এটা ঠেকাতে নজরদারি নিশ্চিত করা দরকার।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সূত্র বলছে, আমদানিকারকদের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের তা দেয়নি বিইআরসি। কমিশন বাড়ানো হয়েছে চাহিদার চেয়ে কম। বাজারে সরবরাহ এখনো বাড়েনি। কোম্পানির প্ল্যান্টে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে ট্রাকের। এতে খরচ বাড়ছে। কোনো কোনো কোম্পানি বাড়তি দাম নিচ্ছে।

সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবু তাহের কোরেশী প্রথম আলোকে বলেন, বিইআরসি নির্ধারিত কমিশনে ঢাকার বাইরে দেওয়া গেলেও ঢাকার মধ্যে কোনোভাবেই সরবরাহ করা সম্ভব নয়। পরিবহন খরচ অনেক বেশি। তাই নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না পরিবেশকেরা।

বাজারে সরকারি দরের চেয়ে বাড়তি দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রির বিষয়টি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও জানে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাড়তি দামের তথ্য আমাদের কাছে আসছে। অনেক সময় একটু গোপনে রেখে বিক্রি করে। বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও অভিযান চালানো হয়েছে, আগামীকালও এটা চলবে।’

ঢাকায় সবখানেই বাড়তি দাম

মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকা এবং উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকার ৮টি খুচরা দোকান, ৪টি ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, সব দোকানে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ বিক্রেতা পরিচিত ক্রেতা ছাড়া অন্যদের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে চাইছেন না। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, যদি সাংবাদিক বা ভোক্তা অধিকারের কেউ চলে আসেন। ক্রেতারা গেলে বলছেন, গ্যাস নেই।

মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় মো. সায়েম নামের এক দোকানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে চাইলে তিনি শুরুতে বলেন, গ্যাস নেই। দুই দিন পরে পাওয়া যাবে। পরে এই প্রতিবেদক বিক্রেতার ফোন নম্বর নিয়ে দুই ঘণ্টা পর কল দিয়ে গ্যাসের খোঁজ করলে তিনি প্রথমে পরিচয় জানতে চান। পরে নাম–পরিচয় এবং বাসার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গ্যাস আছে বলে জানান। তবে দাম চান ২ হাজার ৫০০ টাকা।

উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে আসাদুল্লাহ নূর নামের একজন খুচরা গ্যাস বিক্রেতার কাছে গেলে দেখা যায়, ১২ কেজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন। ২ হাজার ২৫০ টাকায় নিজে কিনেছেন বলে দাবি করেন এই বিক্রেতা।

গ্রামেও দাম বেশি

ঢাকার বাইরে গতকাল পাঁচটি উপজেলার বাজার ঘুরে দামের তথ্য নিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। রাজশাহীর বাগমারা এলাকায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়, পটুয়াখালীর বাউফলে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাঙ্গাইলের সখীপুরের বিভিন্ন দোকানে কেউ কেউ ২ হাজার ২০০ টাকা, কেউ আবার ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

সখীপুরের ডিলার জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহাঙ্গীর তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানি চাহিদা মোতাবেক গ্যাস দিতে পারছে না। এ মাসে এখনো গ্যাস দেয়নি। এর ফলে বাজারে গ্যাসের সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ, গাছতলা, ধর্মপাশা, জয়শ্রী বাজারসহ বিভিন্ন হাটবাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। উপজেলা সদরের ধর্মপাশা পূর্ববাজারের পরিবেশক হাজি ট্রেডার্সের রফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার সব বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ২ হাজার ২০ থেকে ৩০ টাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে এলপিজির দাম সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এ বিষয়ে গত ৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে ‘এলপিজির দাম বাংলাদেশে বেশি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, প্রতিবেশী ভারতের শহর কলকাতার চেয়ে দেশে এলপিজির দাম দ্বিগুণের বেশি। তবে ভারত এলপিজি বিক্রি করে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে। এর বাইরে তারা ভর্তুকিও দেয়। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাতেও এলপিজির দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম। সরকারিভাবে গত জানুয়ারিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি পায় বিপিসি, যদিও এখন পর্যন্ত তারা আমদানি করতে পারেনি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাড়াহুড়া করে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দিয়ে বাণিজ্যের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিইআরসি। এরপর আবার বাড়তি দামে বিক্রি করে ভোক্তার কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র নীরব, এর প্রতিকার জ্বালানি খাতের প্রশাসনে অনুপস্থিত। এটি গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড, বাগমারা, বাউফল, সখীপুর, ধর্মপাশা]

সূত্র: প্রথম আলো