পাহাড়ি পণ্যের খোঁজে ঢাকায় তংসা বাজার
গণমাধ্যম ডেক্স
পাহাড়ি খাবারের স্বাদ আর ঐতিহ্য খুঁজতে এখন আর যেতে হয় না পাহাড়ে; ঢাকার মোহাম্মদপুরেই আছে তংসা বাজার, যেখানে মিলছে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির নানা ধরনের খাদ্যপণ্য। উদ্যোক্তা মাচসিং মারমার উদ্যোগের গল্প।
ঢাকায় পাহাড়ি বাজার ১
বর্ষার পর পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এ সময় পাহাড়ের প্রতি এক অদ্ভুত মোহ ও মায়া কাজ করে। আর বেড়ানো মানে তো শুধু দৃশ্য দেখা নয়; পাহাড়ের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়াও। সুযোগ হলে সেসব খাদ্যপণ্য কিনে আনার ইচ্ছাও থাকে। যাকে বলে রীতিমতো বাজার করা। কিন্তু কত আর বাজার করা যায়? ওজন ও বহনের ঝামেলাও তো কম নয়। তাই শহরবাসী, বিশেষ করে রাজধানীর বাসিন্দারা পাহাড়ি আদিবাসীদের খাবারের রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় করেন।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। একদিকে রেস্তোরাঁয় রান্না করা খাবার খাওয়া, অন্যদিকে খাদ্যপণ্য কিনে নিজেরা রান্না করে খাওয়া। প্রথমটির জন্য ঢাকায় এখন বেশ কয়েকটি আদিবাসী খাবারের রেস্তোরাঁ রয়েছে। আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে রাজধানীতে আছে পাহাড়ি পণ্যের ৩০টির বেশি বাজার।
পাহাড়ি পণ্যের বাজার
এই বাজারগুলোর কথাই বলছিলেন মাচসিং মারমা। তিনি তংসা বাজারের উদ্যোক্তা ও কর্ণধার। মোহাম্মদপুরের রাজিয়া সুলতানা রোডে তাঁর ছোট্ট অথচ জমজমাট একটি দোকান। তংসা অর্থ পাহাড়ি। আমিও মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হওয়ায় একদিন চলে গেলাম তাঁর সঙ্গে গল্প করতে। আমার সঙ্গে কথা বলার ফাঁকেই পণ্য বিক্রি করছিলেন মাচসিং।

সেদিন ছিল মঙ্গলবার, অর্থাৎ বাজারের দিন। সপ্তাহে আরও এক দিন, শুক্রবার বসে এই বাজার। ছুটির দিন হওয়ায় সেদিন ভিড় বেশি হয়। অনেকটা গ্রামের হাটের মতো সপ্তাহে দুই দিন বসে তংসা বাজার।
দোকানে গিয়ে দেখি, ক্যাশ কাউন্টারে বসে কর্মীকে নির্দেশনা দিচ্ছেন মাচসিং। ক্রেতারাও নিজের হাতে পণ্য বাছাই করছেন। তাঁকে সহযোগিতা করছিলেন স্বামী সানু চৌধুরী। এই মারমা দম্পতির বাড়ি রাঙামাটিতে।
দোকানে এক চাকমা শিক্ষার্থীকে দেখলাম তাঁর মাকে নিয়ে বাজার করতে। কেনাকাটার পর কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তাঁরা। বাড়ি খাগড়াছড়িতে। জানালেন, বাড়ি থেকেও খাদ্যপণ্য আনেন, তবে পরিমাণে কম। কারণ, সব সময় আনা সম্ভব হয় না। আবার বেশি আনলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রতিদিনের ও সাপ্তাহিক চাহিদা মেটাতে তংসা বাজারই তাঁদের ভরসা। টাটকা খাবার খেতে চান বলে এখান থেকেই বাজার করেন। তবে খুব বেশি পরিমাণে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী। তাঁদের মতে, এখানকার দামও ঠিক আছে।

কথা হয় আরেক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বাঙালি। তিনিও নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। নিজে এসব খাবার না খেলেও পরিবারের সদস্যরা পছন্দ করেন বলে কেনেন। তংসা থেকে বাজার করার কারণ হিসেবে তিনি ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত পণ্যের কথা উল্লেখ করেন। কী ধরনের খাদ্যপণ্য বেশি কেনেন জানতে চাইলে বলেন, পাহাড়ি দেশি মুরগি, হাঁস ও কাপ্তাই হ্রদের মাছ। তাঁর কাছেও পণ্যের দাম যথার্থ বলে মনে হয়েছে।
মাচসিংয়ের উদ্যোগের গল্প
ক্রেতারা চলে যাওয়ার পর আবার কথা হয় মাচসিংয়ের সঙ্গে। তাঁর এই উদ্যোগের শুরু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। তাঁর স্বামী ফ্রিল্যান্সিং করতেন। হঠাৎ ক্লায়েন্ট কমে যাওয়ায় তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েন। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে খুলে বসেন পাহাড়ি খাদ্যপণ্যের দোকান ‘তংসা বাজার’। পরিবার সহযোগিতা করতে চাইলেও তিনি তা নেননি। দেখতে চেয়েছিলেন, নিজে কী করতে পারেন।

এক বছরের বেশি সময় পর তাঁর উদ্যোগের চিত্রটা কী? এখন তাঁর অধীনে কাজ করছেন চারজন কর্মী। প্রথমে রবি ও বৃহস্পতিবার বাজার বসাতেন। পরে দিন পরিবর্তন করে মঙ্গল ও শুক্রবার নির্ধারণ করেন। ছুটির দিনের কথা বিবেচনায় শুক্রবার এবং সপ্তাহের মাঝামাঝি দিন হিসেবে মঙ্গলবার বেছে নেন।
বাজারের দুই দিন পুরো সময় দেন মাচসিং। বাকি পাঁচ দিন দোকান সামলান তাঁর স্বামী সানু। এই পাঁচ দিন মাচসিং সময় দেন ইন্টার্নশিপ ও প্র্যাকটিসে। ইন্টার্নশিপ করছেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের একটি স্কুলে। পাশাপাশি একই বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞের চেম্বারে প্র্যাকটিস করছেন।
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মাচসিংয়ের বিষয় শিশুবিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক। তিনি বলছিলেন, তংসায় তাঁর স্বামী পূর্ণ সময় দিচ্ছেন। তাই দোকান দেখভালের পাশাপাশি পেশা হিসেবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় কাজ করতে চান।

মাচসিং ঢাকায় আসেন ২০২২ সালে, ফার্মগেটে। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করা। পরে চলে আসেন মোহাম্মদপুরে। স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, দোকান খোলার শুরুর দিকে ভোর চারটায় কলাবাগানে যেতেন রাঙামাটি থেকে বাসে আসা পণ্য আনতে। সেগুলো এনে দোকানে সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষা করতেন। এখন পণ্য গ্রহণ করে দোকানে নিয়ে আসার জন্য কর্মী আছেন।
শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে মাচসিং জানান, এমন দিনও গেছে, যেদিন ৭০ টাকার পণ্যও বিক্রি হয়নি। দিনের পর দিন পণ্য নষ্ট হতো, মন খারাপ হতো। কিন্তু দমে যাননি। একসময় তাঁর মাথায় আসে ‘স্টুডেন্ট বক্স’-এর ধারণা। বিক্রি না হওয়া, কিন্তু খাওয়ার উপযোগী পণ্যগুলো এলাকার আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে দিয়ে দেওয়া হয়। হয়তো এ উদ্যোগই পরোক্ষভাবে তাঁর পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করেছে।
তংসা বাজারে যা পাওয়া যায়

কী বিক্রি হয় মাচসিংয়ের তংসা বাজারে? মৌসুমি খাদ্যপণ্য হিসেবে এখন মিলছে মাছ, রাইশাক, মুলাশাক, আদা ফুল, হলুদ ফুল, শিম ও বাঁশকোড়ল। সামনে আসবে কানাইডিঙ্গা, কাঁচা কাঁঠাল, রাজমা ও মধু। আর বছরজুড়ে পাওয়া যায় পাহাড়ি দেশি মুরগি, হাঁস, মসলা, শুকনা ফল, শুঁটকি, তেল, রাইস নুডলস, চাল, মুড়ি, পেঁপে, কলাসহ নানা পণ্য। এগুলোর মধ্যে মাছ ও মাংস আসে রাঙামাটি থেকে। বাকি অধিকাংশ পণ্য আসে খাগড়াছড়ি থেকে।
যাঁরা কিনতে আসেন
কারা কেনেন এসব পণ্য? আদিবাসী ও বাঙালি ক্রেতার সংখ্যা প্রায় সমান। আদিবাসীরা মোটামুটি সব ধরনের পণ্যই কেনেন। বাঙালিরা বেশি কেনেন মাছ ও ফলমূল। মাচসিংয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাঁর লক্ষ্য ক্রেতা কারা? তিনি জানান, যাঁরা ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত পণ্য কিনতে চান, তাঁরাই মূলত তাঁর লক্ষ্য ক্রেতা। এমন ক্রেতাও আছেন, যাঁরা গাড়ি নিয়ে এসে সপ্তাহের বাজার করে যান।

স্বাভাবিক দিনে তংসা বাজার খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। বাজারের দিন, অর্থাৎ মঙ্গল ও শুক্রবার খোলা থাকে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। রয়েছে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা। তংসা বাজারের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে সময় করে সরাসরি গিয়ে দেখলে আরও ভালো। চোখে দেখে, হাতে ধরে পণ্য কেনার সুযোগও তো থাকছে।
তংসা বাজারের ভবিষ্যৎ
মাচসিং হেসে বলেন, ‘শাখা খোলার ইচ্ছা আছে।’ প্রসন্ন মনে তিনি বলছিলেন, ঢাকায় যতগুলো পাহাড়ি খাদ্যপণ্যের বাজার আছে, সেগুলোর মধ্যে তিনিই একমাত্র মারমা উদ্যোক্তা—এটা তাঁকে ভালো লাগায়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই ভালো অবস্থানে পৌঁছানোর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সুগঠিত সরবরাহব্যবস্থা ও ক্রেতাদের আস্থা। মাচসিংয়ের পরামর্শ, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে সময় নষ্ট না করে নিজেরাই কিছু করলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন।
তংসা বাজার থেকে বিদায় নেওয়ার আগে কথা হয় মাচসিংয়ের এক কর্মীর সঙ্গে। অক্টোবর থেকে এখানে খণ্ডকালীন কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকা কলেজে অনার্স পড়ছেন। কাজটি উপভোগ করছেন বলেও জানালেন।
https://www.facebook.com/share/18EJQkd5fg/
ছবি: লেখক ও সংগৃহীত
সূত্র: প্রথম আলো