|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

অভিবাসী পরিবার থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রথম মেয়র হওয়া কে এই নিত্যা রামন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:০০ এএম
৩১৯ পঠিত
অভিবাসী পরিবার থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রথম মেয়র হওয়া কে এই নিত্যা রামন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
নিত্যা রামনের জন্ম ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায়। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে জয়ের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না নিত্যা রামন। নগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নগর পরিকল্পনাবিদ গত বৃহস্পতিবার রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই শহর আমাকে ও আমার পরিবারকে অনেক কিছু দিয়েছে।’

৪৫ বছর বয়সী নিত্যা রামন আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এই বিশেষ মুহূর্তে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দারা একজন অভিবাসীকে তাঁদের পরবর্তী মেয়র হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে।’

নিত্যা রামনের এই বিজয়ের মাধ্যমে এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি শহর-নিউইর্য়ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও লন্ডন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে যাচ্ছে।

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত নিত্যা রামনের এই জয় নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসির পর যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় শহরে প্রগতিশীল আন্দোলনকে একজন নতুন নেতা এনে দিল।

এমন এক সময় নিত্যা রামন লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচিত হলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় ছিনিয়ে এনেছে ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে দলটি। গত অর্ধশতকের মধ্যে এটিই তাদের সবচেয়ে বড় জয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় জয়ের মধ্যেই নিত্যা রামনের এই বিজয় এসেছে। নিত্যা রমনের প্রচারে সমর্থন দেওয়া সংগঠন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) মধ্যবর্তী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। সংগঠনটির দাবি, তাদের সমর্থন পাওয়া ১০৫ জন প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পথে।

এই বিজয় নিত্যা রামনকে লস অ্যাঞ্জেলেসের জন্য তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো পূরণের একটি বড় সুযোগ এনে দিল। এখন তিনি এই শহরের দীর্ঘদিনের গৃহহীন সংকট দূর করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাধ্যের মধ্যে আবাসন ব্যবস্থার সুযোগ করে দিতে বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন।

লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন নিত্যা রামন

দক্ষিণ ভারত থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের নগর ভবনে

নিত্যা রামনের জন্ম ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায়। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নিত্যা রামন। পড়াশোনা শেষে ভারতে ফিরে যান তিনি। দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই শহরে নগর পরিচালনব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ শুরু করেন।

২০১৯ সালে রাজনীতিতে নাম লেখান নিত্যা রামন। সে বছর লস অ্যাঞ্জেলেসের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেককে অবাক করে দিয়ে সিটি কাউন্সিলের তৎকালীন সদস্য ডেভিড রিউকে পরাজিত করেন তিনি।

২০১৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরেন নিত্যা রামন। সেখানে গৃহহীন মানুষকে সহায়তা করতে একটি অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ‘সেলাহ নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন’ নামের সংস্থাটি মনে করে, গৃহহীন মানুষেরাও সমাজের অন্য সবার মতোই মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ার এবং প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার রাখে।

যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার শিকার নারীদের আইনি সহায়তা দেওয়া অলাভজনক সংস্থা ‘টাইমস আপ’-এ এক বছর বিনোদন বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন নিত্যা রামন। হলিউডের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

২০১৯ সালে রাজনীতিতে নাম লেখান নিত্যা রামন। সে বছর লস অ্যাঞ্জেলেসের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেককে অবাক করে দিয়ে সিটি কাউন্সিলের তৎকালীন সদস্য ডেভিড রিউকে পরাজিত করেন তিনি।

এর মধ্য দিয়ে ডিএসএর সমর্থন পাওয়া প্রথম কোনো প্রার্থী হিসেবে সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন নিত্যা রামন। তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার ও সংগঠিত জনসমর্থন গড়ে তোলাকে ওই জয়ের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

চলতি বছর মেয়র পদে নিত্যা রামনের প্রার্থিতাও স্থানীয় রাজনীতিতে চমক তৈরি করেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই বর্তমান মেয়র ক্যারেন বাসের পক্ষে ছিলেন।

ইসরায়েল গাজায় ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে বলে মনে করেন নিত্যা রামন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।

নিত্যা রামন একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন এবং তাঁর সাবেক মিত্র ক্যারেন বাসকে দেওয়া আগের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। নিজের সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেস এখন এক ‘চরম সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মেয়র ক্যারেন বাসের পক্ষে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির মতো প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতারা জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই সমর্থন কোনো কাজেই আসেনি, নিত্যা রামনের জয় ঠেকাতে পারেনি।

লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে নিত্যা রামন

গৃহহীন–সংকট দূর করার অঙ্গীকার

নবনির্বাচিত মেয়র নিত্যা রামনের নির্বাচনী প্রচারের মূল লক্ষ্যই ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসের দীর্ঘদিনের গৃহহীন–সংকট দূর করা, সাধারণ মানুষের জন্য সাধ্যের মধ্যে আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া।

শহরের আবাসনসংকটকে ‘নৈতিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে নিত্যার প্রচারশিবির।

লস অ্যাঞ্জেলেস গৃহহীন সেবা কর্তৃপক্ষের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে প্রায় ৪৪ হাজার গৃহহীন মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে ২৭ হাজার মানুষ রাস্তায়, গাড়িতে বা তাঁবুতে বসবাস করেন।

নিত্যা রামনের লক্ষ্য হলো, ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে অলিম্পিক গেমসের আসর বসার আগেই শহরের এই গৃহহীন মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এ জন্য তিনি নতুন আবাসন তৈরির পাশাপাশি রাস্তায় থাকা মানুষের জন্য চিকিৎসক দল বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসকে একটি সৃজনশীল ও উদ্যমী শহর হিসেবে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পাশাপাশি, লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ প্রধানকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রামন। তাঁর অভিযোগ, ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার (আইসিই) অন্যায্য অভিযান ঠেকাতে না পেরে পুলিশ প্রধান সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছেন।

ইসরায়েল নীতি ও দলীয় বিতর্ক

নির্বাচনে অনেক প্রগতিশীল মানুষের সমর্থন পেলেও, ইসরায়েলবিরোধী ‘বিডিএস’(বর্জন, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা) আন্দোলনকে নিজের রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ করা নিয়ে ডিএসএর সঙ্গে রামনের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

ইসরায়েল গাজায় ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে বলে মনে করেন নিত্যা রামন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। তবে ব্যাপক বিতর্কের পরও শেষ পর্যন্ত ডিএসএ তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেনি।

সূত্র: প্রথম আলো