|
| |
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

চট্টগ্রামে হাম যেন এক দুর্বিষহ যাত্রার নাম

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
২৯০ পঠিত
চট্টগ্রামে হাম যেন এক দুর্বিষহ যাত্রার নাম
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, শয্যা সংকট, চিকিৎসক ও জনবল স্বল্পতার মধ্যে চলছে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা। কোথাও নির্ধারিত শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের, কোথাও আবার সংকটাপন্ন রোগীর জন্য মিলছে না নিবিড় পরিচর্য...
চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, শয্যা সংকট, চিকিৎসক ও জনবল স্বল্পতার মধ্যে চলছে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা। কোথাও নির্ধারিত শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের, কোথাও আবার সংকটাপন্ন রোগীর জন্য মিলছে না নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা।  অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে। সব মিলিয়ে হামে আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য চিকিৎসা পাওয়ার পথ যেন এক দুর্বিষহ যাত্রায় পরিণত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিটি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ শয্যার বিপরীতে অপেক্ষমাণ একাধিক সংকটাপন্ন শিশু। একদিকে সন্তানের জীবন বাঁচানোর আকুতি, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল ব্যয় মেটানোর অসামর্থ্য এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পেডিয়াট্রিক আইসিইউর প্রথম দিনের ভাড়া প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতিদিনের ভাড়া ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ায়, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে আক্রান্তদের বড় একটি অংশের ভরসা এখন সরকারি হাসপাতাল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে হামে আক্রান্ত শিশুরা। রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে চিকিৎসক ও নার্সদেরও সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যা ও জায়গার সংকটে অনেক শিশুকে কক্ষের বাইরে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা তিন বছর বয়সী এক শিশুর অভিভাবক জানান, গত রোববার চকরিয়া থেকে সন্তানকে নিয়ে চমেক হাসপাতালে এসেছেন তিনি। অক্সিজেন সাপোর্টে বারবার সমস্যা দেখা দিলেও বিষয়টি কর্তব্যরত নার্সদের জানানোর পরও তাৎক্ষণিক সমাধান পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। কালুরঘাট থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন কৃষক মো. ফরিদ। প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে তার সন্তানের জ্বর। গত পাঁচ দিন ধরে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। রোববার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফরিদ বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ কৃষক। অনেক দিন ধরে এখানে পড়ে আছি। আমার বাচ্চার পাশের বেডে থাকা শিশুটি গতকাল মারা গেছে। এখন আমার বাচ্চার আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে। কিন্তু এখানে আইসিইউর কোনো সিট খালি নেই। আর বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানোর সামর্থ্যও আমার নেই। আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব?’ নগরীর মনসুরাবাদ থেকে ছয় বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে চমেক হাসপাতালে এসেছেন পোশাকশ্রমিক রোকসানা বেগম। তার স্বামী রিকশা চালিয়ে সংসার চালান। গতকাল থেকে হাসপাতালের মেঝেতে সন্তানকে নিয়ে অবস্থান করছেন তিনি। রোকসানা জানান, ২৫ অক্টোবর রাতে তার সন্তানের জ্বর আসে। প্রথমদিকে হামের কোনো লক্ষণ ছিল না। পরে তিনদিন ধরে হামের লক্ষণ দেখা যায়। চিকিৎসকেরা শিশুটিকে পরীক্ষা করেছেন। তবে শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। এতে শিশুটির ভোগান্তি আরও বাড়ছে। চমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের নিচতলার হাম ওয়ার্ড এবং দ্বিতীয় তলার শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড মিলিয়ে বর্তমানে ১৫৮ জন হামে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যদিকে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বরাদ্দ ১০টি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ শয্যাও প্রায় সব সময় পূর্ণ থাকছে। একটি শয্যার বিপরীতে তিন থেকে চারজন রোগী অপেক্ষমাণ থাকছেন। হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। বছরের প্রথম দুই মাসে কোনো আক্রান্ত বা মৃত্যুর তথ্য না থাকলেও মার্চে ২০ জন আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয় এবং দুজনের মৃত্যু হয়। এরপর এপ্রিলে ৪৩৮ জন শিশু ভর্তি হয়, মারা যায় ১৬ জন। মে মাসে ভর্তি হয় ৭৯৬ জন, মৃত্যু হয় তিনজনের। জুনে ৬১৫ জন ভর্তি হয়, মারা যায় দুজন। জুলাইয়ে ৬২১ জন এবং আগস্টে ৭৮৮ জন শিশু ভর্তি হলেও ওই দুই মাসে কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই। তবে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ওই মাসে বছরের সর্বোচ্চ ৯৪৯ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মারা যায় ১০ জন। সর্বশেষ অক্টোবরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা ৮৬০। এ মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৫ শিশুর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, হামের সংক্রমণ এখন আর শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চমেক হাসপাতালে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩২ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও ভর্তি হয়েছেন। চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া কালবেলাকে বলেন, ‘সঠিক সময়ে অনেকেই হামের টিকা না পাওয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাছাড়া ছয় মাস বয়স হওয়ার আগে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। এটিও সংক্রমণ বিস্তারের একটি কারণ।’ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট জায়গায় এর চেয়ে বেশি চিকিৎসক কিংবা নার্স বাড়ানোর সুযোগ নেই। অন্য বিভাগ থেকে জনবল বাড়ালেও পেডিয়াট্রিক বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে তাঁদের দিয়ে কার্যকর চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।’ হাম প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে এই চিকিৎসক বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়। তবে যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা যাবে, সংক্রমণ তত বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অনেক অভিভাবক প্রথম ডোজ দেওয়ার পর পরবর্তী ডোজগুলো দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে সব ডোজ নিশ্চিত করতে হবে।’ চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত সেখানে মোট ১ হাজার ৪০৭ জন হামে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু ৪১৫ জন এবং প্রাপ্তবয়স্ক ৯৯২ জন। তবে এ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো রোগীর মৃত্যুর তথ্য নেই। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. একরাম হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পরপরই শিশুদের জন্য আটটি শয্যা নিয়ে একটি আইসোলেশন ব্লক স্থাপন করি। শুরুতে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও আমরা তাঁদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ব্লকের ব্যবস্থা করি। এছাড়া আমাদের ১৮ শয্যার আইসিইউ বিভাগের ১২টি শয্যা হামে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’ অন্যদিকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৫১৮ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫০৫ জন শিশু এবং ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক। এ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ১৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে শুরুতে সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। সাধারণত জ্বর শুরুর তিন থেকে পাঁচ দিন পর মুখমণ্ডল ও কানের পেছন থেকে ছোট লালচে ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ দেখা দিতে শুরু করে। পরে তা দ্রুত গলা, বুক, পিঠ, পেট এবং হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জ্বরের তীব্রতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি কালবেলাকে বলেন, ‘হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমাতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকাতে আইসোলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আমাদের টিকাদান কার্যক্রম চলছে। আগে যেখানে শিশুদের নয় মাস বয়সে টিকা দেওয়া হতো, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এখন সেখানে ছয় মাস বয়স থেকেই টিকা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই প্রায় চার লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’ তবে হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে, টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো, পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করাও এখন সমান জরুরি।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স