|
| |
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ধ্বংসের পথে হবিগঞ্জের দেড়শ বছরের পুরোনো রাসবিহারী সাহার বাড়ি

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
২৮৪ পঠিত
ধ্বংসের পথে হবিগঞ্জের দেড়শ বছরের পুরোনো রাসবিহারী সাহার বাড়ি
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ভারতের আসামের শিলচর থেকে হবিগঞ্জের লাখাইয়ের মোড়াকরি গ্রামে একসময় পায়ে হেঁটে এসেছিলেন রাসবিহারী সাহার পূর্বপুরুষরা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতা অর্জন করে হয়েছিলেন প্রায় ২৪০ বিঘা জমির মালিক। গড়ে তুলেছিলেন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অযত্ন...

ভারতের আসামের শিলচর থেকে হবিগঞ্জের লাখাইয়ের মোড়াকরি গ্রামে একসময় পায়ে হেঁটে এসেছিলেন রাসবিহারী সাহার পূর্বপুরুষরা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতা অর্জন করে হয়েছিলেন প্রায় ২৪০ বিঘা জমির মালিক। গড়ে তুলেছিলেন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অযত্ন-অবহেলা আর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রাসবিহারী সাহার বাড়ি। একসময়কার প্রভাবশালী জমির মালিকের সেই বাড়িটি এখন যেন দেখভালের কেউ নেই।

বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের আসামের শিলচর থেকে পায়ে হেঁটে মোড়াকরি গ্রামে এসেছিলেন রাসবিহারী সাহার পূর্বপুরুষরা। পরবর্তীতে এ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে তারা পাট, কাঠ ও সুপারির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় সফলতা অর্জনের পর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ২৪০ বিঘা জমি ক্রয় করেন তারা। একপর্যায়ে পুরা ইট, চুন, খয়ের ও সুরকি দিয়ে নির্মাণ করেন নান্দনিক একটি বাড়ি, যা আজও তাদের অতীত আভিজাত্যের স্মৃতি বহন করছে।

বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাসবিহারী সাহার বাড়ির পুরোহিত প্রয়াত গোপেশ চক্রবর্তীর ছেলে রামপ্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ‘বাবার জীবদ্দশায় তার কাছ থেকে এসব ইতিহাস শুনেছি। তাদের পরিবার আসামের শিলচর থেকে ব্রিটিশ আমলে মোড়াকরি গ্রামে এসেছিল। তাদের পাঁচ ভাই ছিলেন, হরেন্দ্র রায়, ব্রজেন্দ্র রায়, দেবেন্দ্র রায়, নরেন্দ্র রায় এবং সবার ছোট রাসবিহারী সাহা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতার পাশাপাশি তারা এ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হন।’

তিনি আরও জানান, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর তাদের তিন ভাই কলকাতায় চলে যান। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে রাসবিহারী সাহা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে তিনি তার বাবার কাছ থেকে জেনেছেন। পাকিস্তান আমলের পর তার অন্য ভাইয়েরাও কলকাতায় চলে যান। তবে রাসবিহারী সাহা নিজ বাড়িতেই থেকে যান।

রামপ্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ‘১৯৭৬ সালের দিকে নিজ বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন রাসবিহারী সাহা। তখন আমার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। অন্যদের সঙ্গে আমিও শ্মশানে গিয়ে তার মরদেহের সৎকারে অংশ নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে তার সন্তানরা তাদের মাকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর ১৯৮৪-৮৫ সালের পর থেকে বাড়িটি কে বা কারা লিজ নিয়ে ভোগ দখল করছেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’

স্থানীয়দের ধারণা, একসময় রাসবিহারী সাহার পরিবারকে ঘিরে এ এলাকায় গড়ে উঠেছিল বিশেষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ। বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও নানা স্মৃতিময় ইতিহাস। বাড়িটির পুরোনো দেয়াল, স্থাপত্যশৈলী ও বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আজও অতীত দিনের সাক্ষ্য বহন করছে।

তবে সময়ের পরিবর্তনে পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ, বসবাসের পরিবর্তন এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। একসময় যে বাড়িটি ছিল এলাকার মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু, আজ সেটিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্মৃতি থেকে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে রাসবিহারী সাহার বাড়িটি সংরক্ষণের পাশাপাশি লাখাই উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

এলাকাবাসীর দাবি, বাড়িটির প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ এবং স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক রাসবিহারী সাহার বাড়িটি যেন কালের বিবর্তনে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এখনই প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ। অন্যথায় লাখাইয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায় একসময় হয়তো শুধু প্রবীণদের স্মৃতির পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।
 

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স