|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

মৌখিক সভ্যতার প্রত্যাবর্তন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
১৯৫ পঠিত
মৌখিক সভ্যতার প্রত্যাবর্তন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

মানুষের সভ্যতাকে বদলে দিয়েছিল লেখার আবিষ্কার, বই ও পাঠের বিস্তার। অথচ ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে মানুষ ক্রমেই বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ফিরছে শোনা ও দেখার জগতে। এই প্রত্যাবর্তন কি নতুন এক মৌখিক সভ্যতার সূচনা, যার অভিঘাতে বদলে যাবে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও মানুষের চিন্তার ধরন?

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে নাকি সাত লাখ বই ছিল। বই না বলে প্যাপিরাসের স্ক্রল বললে সঠিক বলা হবে। প্লেটো–অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে সব গ্রিক মহারথীর বইপত্র ছিল সেখানে। সে এক সুবিশাল রত্নভান্ডার। সেই লাইব্রেরি হারিয়ে গেছে পরবর্তী ৪০০ বছরের মধ্যে। আর হারিয়ে গিয়ে এক দীর্ঘ অন্ধকার যুগ নেমে এসেছে ইউরোপে।

এত দিন মনে করা হতো প্রাচীন আমলের যুদ্ধবিগ্রহের বলি হয়ে ওই লাইব্রেরি ধ্বংস হয়েছে। তবে এখনকার ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধ নয়, আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি ধ্বংস হয়েছে অবহেলায়। মানুষের অবহেলা। পরবর্তী যুগে বইপত্রের কদর কমে গিয়েছিল। শাসক ও নাগরিকেরা মনে করেছে, অত পয়সাপাতি খরচ করে ওসব ফালতু প্যাপিরাসের স্তূপ পুষে কী লাভ! ফলে বইপত্র গেছে পোকা আর ইঁদুরের পেটে।

এই অনুমান সত্যি হলে বলতে হবে, আলেকজান্দ্রিয়ায় লাইব্রেরি ধ্বংস হয়েছে বলে অন্ধকার যুগ নেমে আসেনি। বরং ইউরোপজুড়ে অন্ধকার যুগ নেমে এসেছিল বলেই আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি ধ্বংস হয়েছে। অন্ধকার যুগ মানে যে যুগে লোকে আর বই উল্টে দেখে না।

এতকাল পরে মনে হচ্ছে আরেকটি অন্ধকার যুগ সমাসন্ন।

কিছুদিন আগে আমেরিকান জার্নাল দ্য আটলান্টিক-এ একটা দীর্ঘ নিবন্ধ পড়ছিলাম রোজ হরোভিটজ নামে এক গবেষকের। ‘দ্য এন্ড অব রিডিং ইজ হেয়ার’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে হরোভিটজ আক্ষেপ করে জানাচ্ছেন, যে আমেরিকানরা একদা দুনিয়ার সবচেয়ে পড়ুয়া জাতি হিসেবে গর্ব করতে ভালোবাসত, তারা ক্রমাগত পড়তে ভুলে যাচ্ছে। বেশ কিছু জরিপের উল্লেখ করে নিবন্ধকার দেখিয়েছেন, আমেরিকানরা বইটই আর খুব একটা ছুঁয়ে দেখে না। তারা নাকি জুয়া খেলে অবকাশ কাটাতে বেশি আগ্রহী।

বই না পড়ার প্রবণতা দুনিয়াজুড়েই। শুধু বইপত্র নয়, দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী বা জার্নাল—লোকে আর কিছুই পড়তে চায় না। আর যাও বা পড়ে, তার মধ্যেও অবক্ষয়—নিছকই লঘু ও সহজপাচ্য সাহিত্য। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিউইয়র্ক টাইমস–এর বেস্টসেলার তালিকার বইগুলোয় ইদানীং বাক্যের গড় দৈর্ঘ্য আগের চেয়ে এক–তৃতীয়াংশ কমে গেছে।

বই না পড়ার প্রবণতা দুনিয়াজুড়েই। শুধু বইপত্র নয়, দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী বা জার্নাল—লোকে আর কিছুই পড়তে চায় না। আর যাও বা পড়ে, তার মধ্যেও অবক্ষয়—নিছকই লঘু ও সহজপাচ্য সাহিত্য। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিউইয়র্ক টাইমস–এর বেস্টসেলার তালিকার বইগুলোয় ইদানীং বাক্যের গড় দৈর্ঘ্য আগের চেয়ে এক–তৃতীয়াংশ কমে গেছে।

শুধু যে পড়ায় অনীহা, তা–ই নয়; এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতাও কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা পড়তে ভুলে যাচ্ছে বললে বেশি বলা হবে না।

এ পরিস্থিতির এখন একটা নাম দেওয়া হয়েছে: পোস্ট লিটারেট সোসাইটি। বাংলা করলে করা যাক, ‘অক্ষর–পরবর্তী সমাজ’। ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে সমাজের বেশির ভাগ লোক পড়তে পারত না। সেটার নাম প্রি-লিটারেট সোসাইটি বা অক্ষর-পূর্ব সমাজ। ইললিটারেট বা নিরক্ষর নয়।

ছাপাখানার আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ছাপানো অক্ষর বা বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকা সহজলভ্য হওয়ায় সর্বজনীন শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। এখন আমরা প্রায় সবাই পড়তে পারি।

পড়তে শেখা কোনো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। এর জন্য আমাদের মগজকে বিশেষভাবে পুনর্গঠন বা রি–অয়্যারিং করে নিতে হয়েছে। আমাদের চোখ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অবিশ্বাস্য দ্রুতগতির এবং দক্ষ ইমেজ স্ক্যানিং মেশিন। বইয়ের পাতার অক্ষর, শব্দ আর বাক্য ছবি আকারে মগজে পৌঁছালে মগজ দ্রুতবেগে শুরু করে ডেটা প্রসেসিং। তৈরি হয় অর্থ এবং অন্বয়। এ এক দীর্ঘ দুরূহ যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শিকল। আমরা সেটা এমন অনায়াস আর মসৃণ করে ফেলতে পেরেছি, টেরই পাওয়া যায় না পঠনের পেছনে একটা আস্ত প্রোডাকশন কারখানা কাজ করছে।

আবার ভাষার কথা ধরা যাক। গোড়া থেকে লেখার উপযুক্ত হয়ে ভাষার জন্ম হয়নি। মুখের উচ্চারণ ও শ্রবণের উপযুক্ত হয়ে ভাষার জন্ম। লেখা এক জটিল সংকেতব্যবস্থা। এ কারণে মানুষ মুখে বলার চেয়ে ধীরগতিতে লিখতে পারে। আর সে কারণেই যিনি লেখেন, তিনি তার লিখিত বাক্যে মনোনিবেশ করার সুযোগ পান। তিনি চিন্তা করার অবকাশ পান।

এ নিয়ে একটি লেখা সম্প্রতি ছাপা হয়েছে আমেরিকান ডিজিটাল ম্যাগাজিন ‘ভক্স’-এ। এরিক লেভিটজ নামে এক গবেষক বলছেন, মানুষ বই পড়া কমিয়ে দেওয়ায় শুধু একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাসের অবক্ষয় ঘটছে না, আমরা একধরনের ডিজিটাল ওরালিটি বা মৌখিকতার দিকে ফিরে যাচ্ছি। কথাটা পোক্ত করতে তিনি ওয়াল্টার জে অং নামে এক সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদের ‘ওরালিটি অ্যান্ড লিটারেসি’ তত্ত্বের সাহায্য নিয়েছেন।

লেখাকে বলা হয় ভাষার সংহতিকরণ। লেখা মানুষকে বিমূর্ত চিন্তার দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরির সামর্থ্য দেয়। আর এ কারণে মানুষ দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিদ্যার জন্ম দিতে পেরেছে।

এখন পোস্টলিটারেট যুগ বা ‘অক্ষর–পরবর্তী সমাজে’ আমরা পড়তে ভুলে গেলে আমাদের মগজ আরেক দফা পুনর্গঠিত হবে। শুধু মগজ পুনর্গঠিত হবে না, আমাদের সমাজ-সভ্যতা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থারও বদল ঘটবে।

রোজ হরোভিটজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে লেখা ও পঠনের এই সাক্ষর সময়কালটা অতি সংক্ষিপ্ত এক মধ্যবর্তী দশা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এর এক দিকে অনন্ত অক্ষর-পূর্ব যুগ এবং এক দীর্ঘ ‘অক্ষর–পরবর্তী’ যুগ।

কথা হলো, আমাদের বই পড়ার শূন্যস্থানটি কী দিয়ে পূরণ হচ্ছে?

এ নিয়ে একটি লেখা সম্প্রতি ছাপা হয়েছে আমেরিকান ডিজিটাল ম্যাগাজিন ‘ভক্স’-এ। এরিক লেভিটজ নামে এক গবেষক বলছেন, মানুষ বই পড়া কমিয়ে দেওয়ায় শুধু একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাসের অবক্ষয় ঘটছে না, আমরা একধরনের ডিজিটাল ওরালিটি বা মৌখিকতার দিকে ফিরে যাচ্ছি। কথাটা পোক্ত করতে তিনি ওয়াল্টার জে অং নামে এক সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদের ‘ওরালিটি অ্যান্ড লিটারেসি’ তত্ত্বের সাহায্য নিয়েছেন।

লেভিটজের বক্তব্য হলো, অক্ষর-পূর্ব সমাজে জ্ঞান টিকে থাকত মুখে-মুখে। আর সে কারণে কথাকে স্মৃতির উপযুক্ত করে বানিয়ে নিতে হতো। সে কাজে সহায়তা করত ছন্দ ও গল্প। এ কারণে গান, কাব্য আর লোককথার এত বিপুল বৈভব গড়ে উঠেছে অক্ষর-পূর্ব সমাজে। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। দীর্ঘ যুক্তির বদলে ছোট, স্মরণযোগ্য, আবেগ-উদ্দীপক বাক্য লেখা হচ্ছে। মিম তৈরি হচ্ছে। লোকে তার বক্তব্য ভাইরাল করতে নানা রকম চটকদার বাক্য লিখছেন, কৌতুক করছেন। হ্যাশট্যাগ দেওয়ার মধ্যে কত রকম সৃজনশীলতা যে ফুটে উঠছে, অবাক হয়ে যেতে হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, এই নতুন মৌখিকতার যুগে কোনো বক্তব্যের সত্যতা খুব জরুরি নয়। সেটি কতবার ছড়িয়েছে বা কোন গোষ্ঠী সেটিকে সমর্থন করছে সেটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমাদের হাতে আগের চেয়ে অসীম বেশি লিখিত তথ্য থাকলেও, তথ্য সংরক্ষিত হওয়ার চেয়ে সরবরাহ করাটাই তার সামাজিক শক্তির উৎস হয়ে উঠছে।

এই সাহিত্য অবশ্য আগুনের পাশে অনেক মানুষ গোল হয়ে বসে শুনবে না বা বাজারের মাঝখানে বসে কেউ উচ্চ স্বরে আবৃত্তি করবে না। এগুলো টিকটকের ক্লিপ হয়ে ভেসে বেড়াবে নেট থেকে নেটে। অডিওবুক আর পডকাস্ট হয়ে ধ্বনিত হবে গাড়ির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাতাসে। লোকে শুনবে একা একা।

সেদিন মেট্রোরেলে আমার এক পুরোনো সাংবাদিক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা। তাঁর লেখার হাত খুব ভালো। সাহিত্য আর সিনেমার পোকা। ইদানীং অর্থনীতি নিয়ে একটা ভিডিও পডকাস্ট করছেন। আমি সেটা নিয়মিত দেখি। আমি পডকাস্টের প্রশংসা করায় তিনি বললেন, এত দিন ধরে লিখছেন। কত নিবন্ধ, কত প্রতিবেদন। কিন্তু পডকাস্ট করার পর শ্রোতাদের যে বিপুল প্রতিক্রিয়া আর ফিডব্যাক পাচ্ছেন, তা আগে কখনো পাননি। তিনি আর একটা লেখা তৈরির দীর্ঘ কষ্টকর শ্রম দিতে আগ্রহী হবেন বলে আমার মনে হয়নি।

অংয়ের মতে, লেখার আবির্ভাব মানুষকে এমন একধরনের চিন্তার অভ্যাস দিয়েছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে লোকে একটি টেক্সটের সঙ্গে একা

থাকতে পারত। এর ফলে তার পক্ষে জটিল যুক্তি অনুসরণ করা, বিমূর্ত ধারণা নিয়ে চিন্তা করা এবং নিজের চিন্তাকে সামাজিক পরিবেশ থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন করে পরীক্ষা করা সম্ভব হতো। কিন্তু টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব আর পডকাস্টের যুগে আমাদের মনোযোগ ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা যেটাকে সাহিত্য বলি, ভবিষ্যতে সেটা হয়তো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে না, কিন্তু তার প্রকরণ এবং বোধগম্যতার ধরনে পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘ, ধীর, অন্তর্মুখী উপন্যাস হয়তো আর থাকবে না। কাহিনি আরও বেশি খণ্ডিত, এপিসোডিক এবং পারফরমেটিভ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাহিত্য মুখে বলার উপযোগী চেহারা ধারণ করবে, আদিতে যে চেহারায় তার জন্ম হয়েছিল। অর্থাৎ সাহিত্য আবার হয়তো হোমারের যুগে ফিরে যাবে। হয়তো আবার তা শ্রুতিযোগ্য, স্মরণযোগ্য ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য হওয়ার দিকে যাত্রা করবে।

এই সাহিত্য অবশ্য আগুনের পাশে অনেক মানুষ গোল হয়ে বসে শুনবে না বা বাজারের মাঝখানে বসে কেউ উচ্চ স্বরে আবৃত্তি করবে না। এগুলো টিকটকের ক্লিপ হয়ে ভেসে বেড়াবে নেট থেকে নেটে। অডিওবুক আর পডকাস্ট হয়ে ধ্বনিত হবে গাড়ির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাতাসে। লোকে শুনবে একা একা।

অং একে বলেছেন, ‘দ্বিতীয় মৌখিক যুগ’। সহজ ভাষায় বললে বলতে হয়, বকাউল্লা আর শোনাউল্লার যুগ। বই এখানে আর জ্ঞান, চিন্তা ও সংস্কৃতির প্রধান বাহন নয়। আমরা একটি ঐতিহাসিক পর্ব থেকে বেরিয়ে আরেকটি পর্বে প্রবেশ করছি। সেটা কিছুটা অতীতেই ফেরা, নতুন এক চেহারায়। এর ফলে সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ যৌক্তিক চিন্তার যুগ শেষ হচ্ছে। মানুষ আবার শুনতে ও দেখতে অভ্যস্ত হচ্ছে। সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সেদিকে যাত্রা না করে উপায় কী!

শিবব্রত বর্মন: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সূত্র: প্রথম আলো