|
| |
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

মুসলিম বলেই কি বলিউড অভিনেত্রী দিয়ার আতশবাজিবিরোধী ভিডিও বার্তা সরিয়ে দিল মুম্বাই পৌরসভা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম
২২৫ পঠিত
মুসলিম বলেই কি বলিউড অভিনেত্রী দিয়ার আতশবাজিবিরোধী ভিডিও বার্তা সরিয়ে দিল মুম্বাই পৌরসভা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
পৌরসভার অনুরোধে আতশবাজি ও দূষণের বিরুদ্ধে দিয়া ছাড়াও ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত, ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের মতো ব্যক্তিরা। তাঁদের কারও ভিডিও বার্তা সরানো হয়নি।

নির্দেশ ছিল বম্বে হাইকোর্টের। উদ্যোগ নিয়েছিল বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা। তাদের অনুরোধেই ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন অভিনেত্রী দিয়া মির্জা। কিন্তু বিজেপি–শিবসেনার আপত্তিতে পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তা সরিয়ে দেওয়া হলো। কেন সরানো হলো, সেই কারণও স্পষ্ট, দিয়ার ‘ধর্ম’।

দিয়া মির্জার বাবা ফ্র্যাঙ্ক হ্যান্ডরিচ ছিলেন জার্মান খ্রিষ্টান। পেশায় তিনি ছিলেন গ্রাফিকস ডিজাইনার। মা দীপা, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু। দিয়ার জন্মের চার বছর পর মা–বাবার বিচ্ছেদ হলে দিয়ার মা হায়দরাবাদের আহমেদ মির্জাকে বিয়ে করেন। তাঁর স্নেহেই দিয়া পালিত। দিয়া সৎবাবার ‘মির্জা’ পদবিই ব্যবহার করে আসছেন।

৪৪ বছরের দিয়ারও দুই বিয়ে। তাঁর প্রথম স্বামী সাহিল সাংঘা। ২০২১ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বৈভব রেখি নামের এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে।

পৌরসভার অনুরোধে আতশবাজি ও দূষণের বিরুদ্ধে দিয়া ছাড়াও ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত, ক্রিকেটার অজিঙ্কা রাহানে, মারাঠি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী নিশিগন্ধা ওয়াডের মতো ব্যক্তিরা। তাঁদের কারও ভিডিও বার্তা বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা মুছে দেয়নি। দিয়া মির্জা একমাত্র ব্যতিক্রম।

উৎসবের সময় বায়ুদূষণ বৃদ্ধি করে আতশবাজি। আতশবাজি নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার ব্যর্থতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বম্বে হাইকোর্ট। গত ১৫ অক্টোবর হাইকোর্ট এ বিষয়ে পৌরসভাকে উদ্যোগী হতে বলেন। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত মানুষদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।

সেই অনুযায়ী বিনোদন জগতের বিভিন্ন তারকাকে অনুরোধ করে পৌরসভা। দিয়া তাদেরই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে। বম্বে পৌরসভাও বলেছিল, জনহিতের জন্য এ ধরনের কাজে তারকাদের পারিশ্রমিক নেওয়া অনুচিত।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ীই বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা কাজে নামে। তাদের অনুরোধ মেনে নানা তারকার আবেদন পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলা হয়। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের চাপ ও বিরুদ্ধ প্রচার সইতে না পেরে বিজেপি–শিবসেনা পরিচালিত পৌরসভা দিয়ার ভিডিও সরিয়ে দেয়।

বিজেপির মুম্বাই শাখার সভাপতি অমিত সাটম এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তা পোস্ট করেন। পৌরসভাকে ট্যাগ করে তাতে তিনি লেখেন, ‘দীপাবলি কীভাবে উদ্‌যাপন করা উচিত, সেই জ্ঞান আমরা দিয়া মীর্জার কাছ থেকে নেব না। আমাদের সংস্কৃতির শিকড় আমাদের ঐতিহ্যেই নিহিত রয়েছে।’

বিজেপি নেতার ওই বার্তার পর আরও কয়েকজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের পোস্ট দেন। তারপরই বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা দিয়ার পোস্টটি মুছে দেয়। অন্য কারও পোস্টে অবশ্য হাত দেওয়া হয়নি।

পৌরসভার এক কর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশেই ওই প্রচারাভিযান চালানো হয়েছে। তাই বায়ুদূষণ রোধে নিয়মমাফিক বাজি পোড়ানোর বার্তা রয়েছে। শুধু জনরোষের জন্য এক বিশেষ ব্যক্তির বার্তা সরানো হয়েছে।

বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা এর আগে স্বচ্ছতা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে কাজে নামিয়েছিল। তাঁকে দিয়ে প্রচার করিয়েছিল।

দিয়া মির্জার বার্তা কেন সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে পৌরসভার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি বা ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়া হয়নি।

দিয়ার বার্তার বিরোধিতা করেছেন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর শরিক রিপাবলিকান পার্টির নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়ালেও। তিনি বলেছেন, ‘দিয়া অভিনেত্রী। তিনি মুসলিম। তবে এটা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়। ভারতের সংবিধান সব ধর্মের মানুষদের নিজস্ব উৎসব পালনের অধিকার দিয়েছে। হিন্দুরা যেমন ঈদ উৎসবে যোগ দেন, মুসলিমরাও তেমন দীপাবলি পালন করেন। বাজি পোড়ানো দীপাবলির অঙ্গ। তা বন্ধ করা হলে দীপাবলির কিছু তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তবে অবশ্যই অতিরিক্ত দূষণ নিয়ে আমাদের সবারই সতর্ক থাকা উচিত। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কারণ আছে।’

শিবসেনার মুখপাত্র শায়না এনসিও এ বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দীপাবলি আলোর উৎসব। দিয়া মির্জার নামেও ‘দীপ’ রয়েছে। দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় আবেগ কতটা, তা ওঁর বোঝা উচিত। কেউ দূষণ ছড়ানো বা আতশবাজি পোড়ানোর প্রচার করছে না। আমাদের নিজেদেরও আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন আছে। মুম্বাইয়ের জনগণের কী করা উচিত, সে বিষয়ে অন্য কারও কাছ থেকে উপদেশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

দীপাবলি উৎসবে ভারতে ব্যাপকহারে বাজি পোড়ানো হয়

মুম্বাইয়ের মেয়র বিজেপি নেত্রী রীতু তাওড়ে অবশ্য বৃহন্মুম্বাই পৌরসভার এই সিদ্ধান্তের এক ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দিয়া মির্জাকে তিনি বরাবরের হিন্দুত্ববিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন। রীতু তাওড়ে বলেছেন, ‘এর সঙ্গে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের যোগসাজশ নেই। দিয়া মির্জা বারবার হিন্দুত্ববিরোধী ভূমিকা নিয়েছেন। সরকারবিরোধী মন্তব্য করেছেন। অতীতে দেখেছি, তিনি সব সময় বেছে বেছে কিছু বিষয়ের বিরোধিতা করেন। সেটা করার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু বৃহন্মুম্বাই পৌরসভার হ্যান্ডলে তা করা যাবে না।’

রীতু তাওড়ে বলেন, ‘দিয়া মির্জার হিন্দুত্ববিরোধী অবস্থানের জন্যই ওঁর বার্তা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।’

কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের আপত্তি ও বৃহন্মুম্বাই পৌরসভার সিদ্ধান্তের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দিয়া নিজেও। আজ সোমবার তিনি বলেন, ‘বম্বে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাকে দিয়ে তারাই ভিডিও রেকর্ড করিয়েছে, তা নিয়ে অন্যরা কেন সমালোচনা করবেন?’

দিয়া বলেন, বায়ুদূষণ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দূষণ কমানোর চেষ্টা সবারই করা উচিত। কারণ, এটি মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করে এক বার্তায় এই অভিনেত্রী বলেছেন, ‘এই কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দাবি করিনি। ভালো কাজের দিন আর নেই।’

তবে দিয়া মির্জা সমর্থনও পেয়েছেন। হায়দরাবাদের দল অল ইন্ডিয়া মজলিস ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) মুখপাত্র ওয়ারিশ পাঠান ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘অমিত সাটম, শুধু দিয়া মির্জাকেই কেন বাছলেন? একই আবেদন তো মাধুরী দীক্ষিতও করেছেন? নিশিগন্ধা ওয়াডও করেছেন? তাহলে কেন এই ভিন্নতা? একে ঐতিহ্যের পক্ষে দাঁড়ানো বলে না। বেছে বেছে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে দ্বিমুখী নীতিরই পরিচয় পাওয়া যায়। আসল কথা হলো, তাঁর নাম। নামটা দিয়া মির্জা। তাই না?’

সূত্র: প্রথম আলো