খাল নেই, রাস্তা নেই তবুও নির্মাণ হচ্ছে সেতু
গণমাধ্যম ডেক্স
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার ধূলাসার ইউনিয়নের গঙ্গামতি তেত্রিশকানি এলাকায় খাল ও সংযোগ সড়ক না থাকা সত্ত্বেও প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি গার্ডার সেতু।
সেতুটি নির্মাণের যৌক্তিকতা ও জনসাধারণের উপকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, খাল ও চলাচলের রাস্তা ছাড়া সেতুটি নির্মিত হলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তবে মানুষের কোনো কাজে আসবে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ধূলাসার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গঙ্গামতি তেত্রিশকানি এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে সেতুটির নির্মাণকাজ চলছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে নেওয়া প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। গেল বছর কোরবানির পরে কাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে কাজের মেয়াদ নির্ধারিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কাজটির দায়িত্ব পেয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। ৫ আগস্টের পর নির্মাণকাজের দায়িত্ব পান ঠিকাদার জসিম উদ্দিন খান। তবে ঠিকাদার পরিবর্তন ও কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির আশপাশে কয়েকটি বসতঘর থাকলেও সেখানে দৃশ্যমান কোনো খাল কিংবা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত চলাচলের রাস্তা চোখে পড়েনি। এতে সেতুটি নির্মাণের পর কীভাবে মানুষ ব্যবহার করবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় উন্নয়ন হোক, এটা আমরা চাই। কিন্তু যেখানে খাল নেই, রাস্তা নেই, সেখানে এত টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী? সেতু নির্মাণের আগে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা ও জায়গার বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করা উচিত ছিল।’
আরেক বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ‘সেতু হলে মানুষের উপকার হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সেতুর দুই পাশে যাওয়ার মতো রাস্তা নেই। খালেরও অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। তাহলে এই সেতু দিয়ে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে? প্রকল্পের টাকা খরচ হলেই তো উন্নয়ন হয় না, মানুষের কাজে আসতে হবে।’ ব্রিজের চেয়ে একটি সাইক্লোন সেল্টার আমাদের জন্য জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সেতুর নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের কয়েকটি পরিবারের ভোগান্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ঘরবাড়ি নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসে সরেজমিনে দেখুক। জনগণের টাকায় এমন কোনো কাজ হওয়া উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।’
স্থানীয়দের আরও দাবি, কয়েক দিন আগে খালের অস্তিত্ব না থাকায় ভেকু দিয়ে খালের নকশা তৈরির মতো কাজ করতে দেখা গেছে। তাদের প্রশ্ন, প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথভাবে স্থান পরিদর্শন, খালের অস্তিত্ব যাচাই এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সেতুটি স্থানীয়দের হাঁটাচলার সুবিধা দেবে বলে দাবি করেন। তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, নকশা, সম্ভাব্য উপকারভোগী, খালের অস্তিত্ব এবং পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। এসময় তিনি প্রতিবেদককে বিকাশের মাধ্যমে ‘চায়ের অফার’ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিউজ করলে কিছু হবে না বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি পটুয়াখালী জেলা বিএনপি ও সাবেক এক মন্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় দেন।
প্রকল্পের নথি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশের দাবি প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে সেতু নির্মাণের স্থান কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে খাল ও সংযোগ সড়কের অস্তিত্ব যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে কি না এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কী- এসব প্রশ্নের জবাব চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, প্রকল্পটির নকশা, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স