শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ আছে
গণমাধ্যম ডেক্স
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন আবারও দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানিনির্ভর শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আশুলিয়ায় ৫০টির বেশি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি কেবল বেতন-ভাতার বিষয় নয়; এটি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হয়েছে। ফলে নতুন মজুরি কাঠামোর দাবিকে নিছক অতিরিক্ত বেতন চাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি শ্রমিকদের জীবনধারণের ন্যূনতম সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের দাবি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ১৫ অক্টোবর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেরি হয়েছে। শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ এবং কারখানা বন্ধের পর মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া সরকারের আগাম পরিস্থিতি মোকাবিলা ও অংশীজনদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপের ঘাটতিকেই নির্দেশ করে। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে হয়তো বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি এবং উৎপাদনজনিত ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
তবে অর্থনৈতিক ও শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে এক ধাপে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করা তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সীমিত মুনাফার ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানিতে মন্দাভাব, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্থরতা এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কারখানার আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রপ্তানি মূল্যও বাড়তে পারে, যা ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মূল্য–প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের সমপরিমাণ মূল্য দিতে আগ্রহী না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত কারখানামালিকদের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে মালিকদের ব্যবসায়িক সংকটের যুক্তি দেখিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিক অসন্তোষ, কর্মবিরতি, কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ও বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সুতরাং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। মজুরি বোর্ডের দায়িত্ব হবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই মজুরি কাঠামো প্রস্তাব করা। এককালীন বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রয়োজনে ধাপে ধাপে মজুরি সমন্বয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, কারখানা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ব্যয় বহনে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
সরকারেরও উচিত কেবল সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং নিয়মিত সংলাপ, সময়মতো মজুরি পর্যালোচনা এবং কার্যকর শ্রমনীতি নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কেবল কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়; বরং উৎপাদনশীলতা, পণ্যের গুণগত মান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্থিতিশীল শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে শ্রমিকদের ন্যায্য জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা এবং শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং দীর্ঘ মেয়াদে একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পোশাকশিল্প গড়ে তোলার জন্য উভয়ই অপরিহার্য।
# সেলিম রায়হান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম
সূত্র: প্রথম আলো