|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ট্রাম্পের ওপর বাজি ধরেছিলেন নেতানিয়াহু, শেষ পর্যন্ত হারলেন দুজনই

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৩৫ এএম
২৪৭ পঠিত
ট্রাম্পের ওপর বাজি ধরেছিলেন নেতানিয়াহু, শেষ পর্যন্ত হারলেন দুজনই
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর অস্বস্তিতে পড়েছেন ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিক। বিশেষ করে দেশটির ডানপন্থিরা ওয়াশিংটনে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত নেতাদের এমন ভরাডুবির মাত্রা বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন। ইসরায়েলের প্রধান...
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর অস্বস্তিতে পড়েছেন ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিক। বিশেষ করে দেশটির ডানপন্থিরা ওয়াশিংটনে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত নেতাদের এমন ভরাডুবির মাত্রা বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি ট্রাম্পের অবিচল সমর্থন ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রায় অদ্বিতীয়। গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি এমন বোকামিপূর্ণ বিদেশি যুদ্ধে জড়াবেন না, যেগুলোর কখনো শেষ হয় না। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। এর পরপরই ইরানের পাল্টা হামলা শুরু হয় এবং পুরো অঞ্চলে সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কার মধ্যে গত মঙ্গলবারের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন এবং গত সপ্তাহের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে একে অপরের প্রতি জোরালো সমর্থন জানান দুই নেতা। নিজ নিজ দেশের ভোটারদেরও মিত্রের পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানান তারা।  আর এ সময়ে নেতানিয়াহুর বাজি ট্রাম্পের ওপরই ছিল। তবে তাদের এই প্রচেষ্টা উল্টো ফল দিয়েছে, অথবা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট পেয়েছে মাত্র ৫৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে তা অনেক কম। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ডেমোক্র্যাটদের কাছে হারিয়েছে ট্রাম্পের দল। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও কানসাসের মতো  জায়গাতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক এবং ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’-এর পরিচালক শিবলি তালহামি মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বলেন, ‘স্পষ্টতই আমরা ইতিহাসের এক রাজনৈতিক সুনামি প্রত্যক্ষ করেছি, যা ট্রাম্পবাদের প্রতি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের শামিল। তাই বিষয়টি কেবল একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে পররাষ্ট্রনীতি ছিল এর অন্যতম প্রধান বিষয়। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। কারণ, মার্কিন নাগরিকেরা এসব বিষয়কে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।’ যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে দৃঢ় কূটনৈতিক ও সামরিক মিত্র। বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের সমালোচনা করে আনা কয়েক ডজন প্রস্তাব আটকে দিতে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে ওয়াশিংটন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো প্রস্তাবও ছিল। একই সঙ্গে প্রতিবছর ইসরায়েলকে অন্তত ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সক্ষম এমন অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারছে ইসরায়েল। তবে এই সহায়তা এখন ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় মূল্য তৈরি করছে। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে তালহামির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছে ইসরায়েল। তালহামির মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন অনেক ভোটারের কাছে সম্পদের চেয়ে বোঝা হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষই বলেছেন, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল একটি বিবেচ্য বিষয় হবে। এর চেয়েও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ তাদের ভোটে প্রভাব ফেলবে। আর তারা এই যুদ্ধের সঙ্গে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা দেখছেন।’ ‘কুকুরের লেজ নাড়ানোর’ পরিস্থিতি  মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় স্বীকার করে নিয়েছেন ট্রাম্প। জ্বালানির দামের ওপর প্রভাবের কারণে ইরান যুদ্ধও তার পরাজয়ের পেছনে আংশিক দায়ী বলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিয়েছেন তিনি। তবে নিজের নির্বাচনি পরাজয়ের পর থেকে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নেতানিয়াহু। গত এক সপ্তাহে লিকুদ পার্টির এই নেতা মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, বিদেশি শক্তিগুলো অবৈধভাবে ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভোট বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতীয় সরকার গঠনের ভিত্তি হিসেবে ইহুদি ভোটারদের মধ্যে নিজের দলের বিজয়ের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিল রেখে নেতানিয়াহু এমনকি নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। তবে ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য জোট নিয়ে দর-কষাকষি শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হোয়াইট হাউসে তাদের মিত্রের পরাজয় এবং এর পেছনে নিজেদের সম্ভাব্য দায় নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। বুধবার ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর প্রায় সব পদক্ষেপই তাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণের অযোগ্য করে তুলেছে। এর মধ্যে আরব দলগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ চলার সময় এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সমঝোতা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না থাকলেও সময়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন এবং দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে জনরোষ ঠেকাতেই তিনি এমন মন্তব্য করে থাকতে পারেন। ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যে গভীর পরিবর্তন ঘটছে, তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে ইসরায়েলের মধ্যে একধরনের অস্বীকারের প্রবণতা রয়েছে।’ তার মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরায়েল সরাসরি কোনো ইস্যু না হলেও ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘কুকুরের লেজ নাড়ানোর’ যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি নির্বাচনে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে। লেভি বলেন, ‘সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাবটি ছিল ইরান যুদ্ধের। এর একটি অংশ হলো, আরেকটি বিপর্যয়কর মধ্যপ্রাচ্য অভিযানে একজন সহজে প্রভাবিত হওয়া প্রেসিডেন্টকে টেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ভূমিকা।’ তার মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার নির্বাচনি মূল্য সম্পর্কে মার্কিন জনগণের কাছে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার মুখে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনে পরিবর্তন আসতে পারে, জোট গঠনের বিকল্পগুলো বিবেচনার সময় ইসরায়েলের বিরোধী নেতাদের মনেও বিষয়টি থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কিছু অংশের কাছে নেতানিয়াহু অজনপ্রিয় হলেও ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করার নতুন উদ্যোগ নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ করে দিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন লেভি। তিনি বলেন, ‘এখন সেই উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হবে। তবে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে যখন নেতৃত্বে রয়েছেন একজন ক্ষতবিক্ষত ট্রাম্প।’ নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন একটি প্রকৃত সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। এর পরিণতি সম্পর্কে ইসরায়েলের অনেকেরই যথেষ্ট ধারণা বা বোঝাপড়া নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। পিনকাস বলেন, অনেক কিছুই নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধ এবং নির্বাচনে নিজের ও নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধে পাওয়া বড় প্রত্যাখ্যানের জবাবে ট্রাম্প কী করেন, তার ওপর। তিনি সংঘাত আরও বাড়াতে পারেন, আবার কংগ্রেসকে সন্তুষ্ট করতে কোনো সমঝোতার পথও খুঁজতে পারেন। তবে তার মতে, যে পথই বেছে নেওয়া হোক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি ইতিমধ্যে মৌলিকভাবে বদলে গেছে। পিনকাস বলেন, ‘৩৮০ কোটি ডলারের অনুদান বন্ধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো ধরনের বিনিময়মূলক সমঝোতা ছিল; এমন নানা জল্পনা থাকলেও ওই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত অস্ত্রপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থ ছাড়া হয়তো ইসরায়েল চলতে পারবে; কিন্তু অস্ত্রের ওপর তারা নির্ভরশীল। অথচ এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। ভবিষ্যৎ কৌশলগত কোনো চুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়নি। সবকিছু এখনো অনিশ্চিত।’ সূত্র : আল জাজিরা

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স