|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কট্টরপন্থি মিলারকে চিফ অব স্টাফ করলেন ট্রাম্প, যেভাবে তার উত্থান

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
৩৫৪ পঠিত
কট্টরপন্থি মিলারকে চিফ অব স্টাফ করলেন ট্রাম্প, যেভাবে তার উত্থান
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা কট্টরপন্থি স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বিপর্যয়কর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পদত্যাগকারী সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন তিনি। অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে কঠোর...

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা কট্টরপন্থি স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বিপর্যয়কর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পদত্যাগকারী সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন তিনি।

অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য এক ভয়ংকর খ্যাতি অর্জন করেছেন মিলার। তিনি ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অন্যতম কট্টর সমর্থকও।

শনিবার (০৭ নভেম্বর) এক প্রতিবেদনে দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, স্থানীয় সময় শুক্রবার এই মিলারকে নিয়োগের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।আগামী সোমবার থেকে সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হবেন ৪১ বছর বয়সী মিলার। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধাক্কার পর ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে তার বিতর্কিত নীতিগুলোর প্রতি আরও জোরালো সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। হোয়াইট হাউসে মিলারের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে দলটি। বিশেষ করে অভিবাসননীতি, গণহারে বহিষ্কার এবং বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে তার প্রভাব তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প মিলারকে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত মিলার দীর্ঘদিন ধরেই তার সবচেয়ে সোচ্চার সমর্থকদের একজন।

রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার অনেক আগে থেকেই রক্ষণশীল রাজনীতিকর্মী হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন মিলার। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় স্থানীয় বেতারের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদারপন্থি নীতির সমালোচনা করতেন।

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ল্যাক্রস খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর তাদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন মিলার।

পড়াশোনা শেষে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের আইনপ্রণয়নবিষয়ক সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে রিপাবলিকান সিনেটর জেফ সেশন্সের সহযোগী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন মিলার। প্রচারের বার্তা তৈরি এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন ২০১৭ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিলেন, শুরু থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মিলারের বোঝাপড়া ভালো ছিল। তার মতে, ট্রাম্পকে নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন মিলার।

প্রথম মেয়াদে বিতর্কিত ভূমিকা

২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও ভাষণ লেখকের দায়িত্ব পান মিলার। অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতি প্রণয়নে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব নীতির পক্ষে তিনি প্রায়ই পশ্চিমা সভ্যতা রক্ষার যুক্তি তুলে ধরতেন। তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ ছিল, তার বক্তব্যে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন পোভার্টি ল’ সেন্টার কিছু ইমেইল প্রকাশ করে। সংস্থাটির দাবি, এসব ইমেইলে মিলারের শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইট ও মতাদর্শের প্রতি সমর্থনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পর তাকে হোয়াইট হাউস থেকে সরানোর দাবি জোরালো হয়। ২০২০ সালে কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো অভিযোগ করেন, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী কাউকে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী পদে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে বিচার বিভাগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রণয়নেও মিলারের ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। এই নীতির আওতায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সীমান্ত পেরোনো প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ব্যাপকভাবে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিশুদের অপরাধীদের আটককেন্দ্রে মা-বাবার সঙ্গে রাখার অনুমতি না থাকায় তাদের আলাদা করে রাখা হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে পরে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নীতিটি পরিবর্তন করেন ট্রাম্প।

২০১৭ সালে কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতিতেও তার প্রভাব ছিল। সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরিমার্জিত সংস্করণটি পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পায়।

এছাড়া ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্পের করা দাবি সমর্থন করেন মিলার। নির্বাচনে ট্রাম্পকে বিজয়ী ঘোষণা করার একটি পরিকল্পনার পক্ষেও অবস্থান নেন তিনি।

দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন অভিযান ও বিতর্ক

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সময়ও তার পাশে ছিলেন মিলার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরলে তাকে নীতিবিষয়ক উপপ্রধান এবং স্বদেশ নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা করা হয়।

এরপর থেকে ট্রাম্পের গণহারে অভিবাসী বহিষ্কার অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি। দেশজুড়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান জোরদার হয়েছে। এসব অভিযানে অপরাধের রেকর্ড নেই, এমনকি সামান্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন।

২০২৫ সালের মে মাসে ফক্স নিউজকে মিলার বলেছিলেন, প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। ট্রাম্প প্রতিদিন এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।

অভিবাসন কর্মকর্তাদের কঠোর ও সহিংস কৌশলের পক্ষেও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন মিলার। মিনিয়াপোলিসে জানুয়ারিতে অভিযানের সময় রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রথমে দুজনকেই সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে অভিযানকে সমর্থন করেন তিনি। পরে প্রেটি সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য থেকে সরে আসেন।

ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বাতিলের উদ্যোগেও মিলারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এ ধরনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর।

২০২৩ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কংগ্রেসের প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী সদস্য রাশিদা তালিবকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছিলেন মিলার। তালিবসহ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটকে কট্টর ইহুদিবিদ্বেষী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মিলার। তবে সে চেষ্টা সফল হয়নি। পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপেরও জোরালো সমর্থক তিনি। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সিএনএনকে তিনি বলেন, সামরিক শক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ড দখলের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার নিয়ে যত কথাই বলা হোক, বাস্তব বিশ্ব পরিচালিত হয় শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে। এগুলোই পৃথিবীর ‘কঠিন নিয়ম’, যা আদিকাল থেকে চলে আসছে।

চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব কী?

হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মূলত প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের প্রশাসনিক ও নীতিগত কার্যক্রম সমন্বয় করেন। তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি, নিয়োগ, প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি ও বৈঠকের সময়সূচি পরিচালনা এবং নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া।

প্রেসিডেন্টের কাছে কোন তথ্য পৌঁছাবে এবং কারা তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন, তা নিয়ন্ত্রণেও এই পদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এ কারণে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে চিফ অব স্টাফকে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের ‘দ্বাররক্ষক’ বলা হয়।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ, আল জাজিরা

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স