|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ঋণের এই মহাসাগর থেকে কীভাবে উদ্ধার পাবে সরকার

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
৪০১ পঠিত
ঋণের এই মহাসাগর থেকে কীভাবে উদ্ধার পাবে সরকার
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
কর্ণফুলী টানেলে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আনোয়ারা অংশে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট বানানোর মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকা স্রেফ অপচয় করা হয়েছে। ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে ২ হাজার ৮০০...

বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সম্প্রতি ২০৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা জিডিপির ৪০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ সরকার ক্রমেই ঋণের মহাসাগরে ডুবে যাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা তাঁর সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনের সময় ঋণের মহাসাগরে ডোবার এই ব্যবস্থা প্রধানত করে গেছেন। হাসিনার পতনের পর ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ নেওয়ার এহেন খায়েশে রাশ টেনে ধরেনি, বর্তমান বিএনপি সরকারও এ ব্যাপারে তাদের কঠোর সংযম প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষত, অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের ব্যাপারে বিএনপি সরকারকে সংযমী হতে দেখা যাচ্ছে না।

বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আসল ও সুদ পরিশোধ খাতে বরাদ্দ বাজেটের ব্যয় বরাদ্দের প্রধান খাত শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। আগামী ২০২৮-২৯ অর্থবছরের বাজেট থেকে সরকারি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ খাত বাজেটের ব্যয় বরাদ্দের সবচেয়ে বড় খাতে পরিণত হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের জন্য প্রতিবছর আরও বেশি ঋণ গ্রহণ করতে হবে। এটাকেই বলা হবে ‘ঋণ ফাঁদ’—ঋণের মহাসমুদ্রে ডুবে যাওয়া।

২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৬ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ২৩ শতাংশের বেশি। বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফের মতে বৈদেশিক ঋণ একটি দেশের জন্য তখনই বিপজ্জনক বিবেচিত হয়, যখন তা জিডিপির ৪০ শতাংশ অতিক্রম করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, এখনো বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বিপজ্জনক স্তরে উন্নীত হয়নি; কিন্তু নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করলে ঘনায়মান বিপদটা বোঝা যাবে।

কর্ণফুলী টানেলে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আনোয়ারা অংশে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট বানানোর মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকা স্রেফ অপচয় করা হয়েছে। ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি স্রেফ বরবাদ করার পর সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্লো অব এক্সটার্নাল রিসোর্সেস ইনটু বাংলাদেশ’ প্রকাশনা মোতাবেক বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত জিডিপির ১৫ শতাংশের কম ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ৩৮ শতাংশ এসেছে বিশ্বব্যাংক থেকে, ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি থেকে, ১৭ শতাংশ এসেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাইকা থেকে, ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে এবং মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে। ওপরে উল্লিখিত ঋণের সূত্রগুলো থেকে বাংলাদেশ প্রধানত ‘সফট লোন’ নিয়েছে, যেগুলোর সুদের হারও কম এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও অনেক বেশি থাকে।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি স্রেফ বরবাদ করার পর সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে।

আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে বাংলাদেশ গত ৫৫ বছরে কখনোই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। উপরন্তু ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিবছর আমাদের বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে যে কিস্তি পরিশোধ করতে হতো, সেটিও সরকারের বাজেটের ৫ থেকে ৬ শতাংশের মতো হতো; কিন্তু হাসিনার স্বৈরশাসনের শেষের দশকে একের পর এক মেগা প্রজেক্টের নামে সরকার বেধড়ক অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের এক মহাযজ্ঞ চালিয়ে মহা লুটপাটতন্ত্র কায়েম করায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বেড়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা এখনো জোরগলায় দাবি করে যাচ্ছেন যে হাসিনার ২০০৯-২৪ মেয়াদের শাসনামলে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। চোখের সামনে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা রেলপথ, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ও দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার রেলস্টেশন কিংবা ঢাকা এয়ারপোর্টের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্প থাকায় তাদের এমন দাবি সাধারণ জনগণ গ্রহণযোগ্য মনে করছে; কিন্তু এসব দৃশ্যমান মেগা প্রকল্পগুলো চমকপ্রদ মনে হলেও এর প্রতিটির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অবিশ্বাস্য পুঁজি লুণ্ঠনের কাহিনি।

আমরা যারা প্রতিটি প্রকল্পের মাধ্যমে পুঁজি লুণ্ঠনের কাহিনিগুলোর প্রকৃত হালহকিকত বুঝতে সক্ষম, তারা আগাগোড়াই বুঝতে পারতাম যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে হাসিনা এ দেশে অভূতপূর্ব স্বৈরশাসন ও লুটপাটতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, যার খেসারত জনগণকে দিয়ে যেতে হবে বহুবছর ধরে।

চব্বিশে হাসিনা সরকারের পতনের দিনে বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ ২০০৯ সালে হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার দিনে বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এর মানে, এই দুই ঋণের স্থিতির অঙ্কের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। অথচ হাসিনা সরকার পতনের আগে এই সুবিশাল ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের মহাসাগরে দেশের জনগণকে নিমজ্জিত করে প্রতিবছর মাথাপিছু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে চলেছিল, যাকে বলা চলে জনগণের সঙ্গে ভয়ানক প্রতারণা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে কিস্তি পরিশোধ করতে বাজেট বরাদ্দ ছিল আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো; কিন্তু ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার বিলিয়নের বেশি। আগামী অর্থবছরগুলোতে এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে হবে।

আরও গুরুতর হলো যেভাবে অভ্যন্তরীণ খাতগুলো থেকে বর্তমান সরকার ঋণ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরগুলোতে সরকারের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে।

সমস্যার মূল রয়ে গেছে সরকারি রাজস্ব বাংলাদেশের জিডিপির ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার মধ্যে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশের রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের পাঁচ বছরে তা কমতে কমতে ৭ শতাংশের কাছাকাছি এসে গেছে।

একদিকে স্বল্প প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের মহাযজ্ঞ, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের ব্যর্থতা। এই দুইয়ের অনিবার্য ফল হলো সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের শেষের পাঁচ বছর প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ দেশের জিডিপির ২৩–২৪ শতাংশে স্থবির হয়ে পড়েছিল; কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারকে প্রতিবছর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর জন্য সরকারি খাতের বিনিয়োগকে শেখ হাসিনা বাড়িয়েই চলেছিলেন।

অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে লাগামহীন ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ যেখান থেকেই পাওয়া গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য তা গ্রহণে চরম খামখেয়ালিপনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে কয়েক শ রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী ব্যাংকিং খাতে ঋণ লুণ্ঠনের এক অবিশ্বাস্য দুষ্টচক্র গড়ে তুলেছে।

হাসিনা আমলের ‘১ নম্বর সমস্যা’য় পরিণত হয়েছিল পুঁজি পাচার। অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশে গঠিত ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটি বলেছে, স্বৈরশাসক হাসিনার লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এখন জানা যাচ্ছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকার নিচে, বাকিটা স্রেফ লুণ্ঠিত হয়েছে। রূপপুর প্রকল্পে এক লাখ তেরো হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বলা হলেও প্রকৃত ব্যয় নাকি এর অর্ধেকের কম।

কর্ণফুলী টানেলে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আনোয়ারা অংশে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট বানানোর মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকা স্রেফ অপচয় করা হয়েছে। ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি স্রেফ বরবাদ করার পর সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকার ঋণের মহাসাগর থেকে সরকারকেও আদৌ উদ্ধার করতে পারবে কি না, সেটি দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

  • ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
    মতামত লেখকের নিজস্ব

সূত্র: প্রথম আলো