|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার–পানি মজুত করার ট্রেন্ড এল কোথা থেকে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:০০ এএম
২৬৬ পঠিত
জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার–পানি মজুত করার ট্রেন্ড এল কোথা থেকে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
শুধু যুক্তরাজ্য নয়, জার্মানি, নরওয়ে, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের ঠিক কী কী জিনিস কেনা প্রয়োজন? কেনই–বা আমরা হঠাৎ এসব কিনছি?

ইদানীং জরুরি প্রয়োজনে জিনিসপত্র জমানোর বা মজুত করার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। তবে এবারের এই মজুতকারীদের ধরনটা একদম আলাদা। কোনো অদ্ভুত বা গোপন তত্ত্বে বিশ্বাস করে তারা কাজ করছে না। সরকার ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দেওয়া সতর্কবার্তার পরেই সবাই এমনটা করছে। কারণ, সবাইকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আবার কোভিডের সময় যারা হুট করে সবকিছু কিনে ফেলত, তাদের সঙ্গে মিল নেই। কারণ, ঠিক কী কারণে তারা এসব জিনিস সংগ্রহ করছে, তা তারা বেশ ভালোভাবেই জানে।

যুক্তরাজ্যে সরকার সম্প্রতি জনগণকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রতিটি পরিবার যেন অন্তত তিন দিনের জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাড়িতে গুছিয়ে রাখে। সরকারের এই আহ্বানের পর পুরো দেশের মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন জেগেছে, কেন হঠাৎ এই প্রস্তুতি?

শুধু যুক্তরাজ্য নয়, জার্মানি, নরওয়ে, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের ঠিক কী কী জিনিস কেনা প্রয়োজন? কেনই–বা আমরা হঠাৎ এসব কিনছি? আর এই পুরো বিষয়টি কি সত্যিই নতুন কিছু?

মহাবিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা কম হলেও যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার তালিকায় এসব বিপদের বিষয় যুক্ত থাকা প্রয়োজন

বিপদের তালিকায় নানা আশঙ্কা

এই নতুন উদ্বেগের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ নেই। তবে মুশকিল হলো, আমাদের সামনে এখন একের পর এক সম্ভাব্য বিপদের তালিকা জমে গেছে।

অনেক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশেষজ্ঞ বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে নতুন এই প্রযুক্তি মানুষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। প্রযুক্তি যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁরা নিজেরাও হয়তো এত দূর ভেবে দেখেননি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যেই এআই দিয়ে তৈরি ক্ষতিকর ভাইরাসগুলো বিভিন্ন দেশের জরুরি ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত হানতে পারে।

সমস্যাটি কেবল এআই নতুনভাবে আক্রমণ করবে, তা নয়; বরং এটি এত দ্রুত ও বড় পরিসরে সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে পারে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্প্রতি ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে এমনই এক ঘটনা ঘটেছে। এআই এমন কিছু মারাত্মক ভুল খুঁজে পেয়েছে, যা প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল শুরুর গল্প।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা

এখন পৃথিবীর মানচিত্রে যেকোনো জায়গায় হাত দিলেই দেখা যাবে, কোনো না কোনো অঞ্চলে যুদ্ধ বা সংঘাত চলছে। যুদ্ধ হয়তো বহু পুরোনো বিষয়, কিন্তু আগের যুদ্ধগুলোর সঙ্গে এখনকার পার্থক্যে সবচেয়ে বড় কারণ পারমাণবিক অস্ত্র।

লেখক অ্যানি জ্যাকবসেন তাঁর ‘নিউক্লিয়ার ওয়ার: আ সিনারিও’ বইয়ে তুলে ধরেছেন, হঠাৎ কোনো দেশে পারমাণবিক হামলা হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

এমন হামলা শুরু হলে তা একটির পর একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। সাবমেরিন থেকে একের পর এক পারমাণবিক মিসাইল বের হয়ে আসবে। বিশ্ব ঢেকে যাবে ঘন কালো অন্ধকার আর তীব্র ঠান্ডায়, যাকে বলা হয় ‘পারমাণবিক শীত’। সেই পরিস্থিতিতে ঘরের সামান্য জমানো খাবার কোনো কাজেই আসবে না।

বর্তমানে আমরা এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সুপার এল নিনো’ বলে ডাকছেন

উদ্বেগ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত

পরিস্থিতি সত্যিই ভীতিজনক। তবে আমাদের এটিকে ধরে নেওয়ার দরকার নেই যে এই ধ্বংস অনিবার্য। লেখক জ্যাকবসেন মনে করেন, ‘ভয়ের বদলে আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। সঠিক তথ্য জানলে আমরা পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’

এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকবসেন বলেন, আসল বিপদের জায়গা হলো তথ্যের অভাব। এই পারমাণবিক ব্যবস্থাগুলো কতটা বিপজ্জনক, তা যখন মানুষ জানবে এবং বুঝবে যেকোনো মুহূর্তে বড় প্রযুক্তিগত ভুল হতে পারে, তখনই মানুষ সচেতন হবে। তাই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

তাপমাত্রার চরম রূপ

বর্তমানে আমরা এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সুপার এল নিনো’ বলে ডাকছেন। এটি এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অঞ্চলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ায়। ফলে বিশ্বের এক প্রান্তে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টি দেখা দেয়, আবার অন্য প্রান্তে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এবারের এল নিনো অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর হতে পারে।

বিশ্বের এক পাশে অতিরিক্ত পানি আর অন্য পাশে তীব্র পানির সংকট—এই পরিস্থিতি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সারা বিশ্বে বারবার চরম ও অস্বাভাবিক আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা দেশের সংঘাত ও যুদ্ধের পরিস্থিতি, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলা কেনাবেচা ও পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তা, দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

ভয়ের চেয়ে প্রস্তুতিই আসল

পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছেই বেশ ভীতিজনক মনে হতে পারে। এর একটি বড় কারণ হলো, দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তের খারাপ খবর বা দুর্যোগের কথা আমরা এখন খুব দ্রুত জানতে পারি। ফলে মনে হয়, আমরা যেন কোনো শেষহীন বিপদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। গণমাধ্যমে এসব বিপদ নিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার বেড়ে যাওয়ায় মনে হতে পারে যে সমস্যা হয়তো চরমে পৌঁছেছে। তবে সত্যি বলতে, এই সতর্কবার্তাগুলো নতুন কিছু নয়।

গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছিল, যেন যেকোনো বিপদের সময় অন্তত ৭২ ঘণ্টা তাঁরা নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটাতে পারেন। আসল কথা হলো, কোনো বিপদ আসার পর অসহায় হয়ে বসে থাকার চেয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

তাহলে আমাদের কী কী প্রয়োজন

জরুরি পরিস্থিতির জন্য জিনিসপত্র জমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কাজটি ধীরে ধীরে করা। এতে একবারে খরচের চাপ পড়ে না। আবার কোভিডের সময় যারা হুট করে সবকিছু কিনে ফেলেছিল, তাদের মতো অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয় না।

যুক্তরাজ্য সরকার ঘরে যেসব জরুরি জিনিস রাখা প্রয়োজন, তার একটি তালিকা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, অন্তত তিন দিনের জন্য পর্যাপ্ত পানি জমিয়ে রাখতে হবে। হিসাব অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন তিন লিটার পানি প্রয়োজন। সঙ্গে এমন খাবার বেছে নিতে হবে, যা সহজে নষ্ট হয় না, অনেক দিন ভালো থাকে এবং রান্নার প্রয়োজন হয় না।

রাখতে হবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ভেজা টিস্যু (ওয়েট ওয়াইপস) ও টুথপেস্ট। টর্চলাইট ও অতিরিক্ত ব্যাটারি। এ ছাড়া ঘরের সবাইকে ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত কম্বল বা স্লিপিং ব্যাগ। যোগাযোগের জন্য একটি এফএম রেডিও, যা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চার্জ দেওয়া যায়, এমন হলে ভালো এবং মুঠোফোনের জন্য একটি চার্জ করা পাওয়ার ব্যাংক।

বিপদের সময় খরচের জন্য কিছু টাকা, নিজের পরিচয়পত্রের কপি এবং জরুরি ফোন নম্বরগুলো খাতায় লিখে রাখা। আর নিয়মিত খাওয়ার প্রয়োজন হয়, এমন ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত এবং প্রাথমিক চিকিৎসার একটি ছোট বাক্স বা ফার্স্ট এইড কিট। পোষা প্রাণীর জন্য এমন খাবার, যা রান্না বা সেদ্ধ করতে হয় না। আর শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াপার ও ভেজা টিস্যু।

বর্তমান পৃথিবীর পরিস্থিতি দেখে ভয় পাওয়া খুব স্বাভাবিক, তবে অনেক সময় অতিরিক্ত আতঙ্কও ছড়ানো হয়। তাই কেউ যদি বলে ৯০ দিনের প্রস্তুতি নিতে হবে, তবে তাতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। এই পরামর্শ মূলত সামরিক ঘাঁটির জন্য দেওয়া হয়েছিল। আমরা সচরাচর যেভাবে কেনাকাটা করি, তাতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময়ের জিনিস এমনিতেই আমাদের ঘরে থাকে। আশা করা যায়, এই কঠিন সময় একদিন ঠিকই কেটে যাবে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

সূত্র: প্রথম আলো