|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভারত–ত্যাগের কাহিনি

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
৩১৮ পঠিত
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভারত–ত্যাগের কাহিনি
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করতে সুভাষ বোস কীভাবে উধাও হয়ে যান, তার চমকপ্রদ কাহিনি বর্ণনা করেছেন শিশির বোস তাঁর বইয়ে।

২০০৫ সালের ১৯ আগস্ট প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে ‘নেতাজির ভারত–ত্যাগের কাহিনি’ শিরোনামে এ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এত দিন শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে থাকা লেখাটি আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

কলকাতার এলগিন রোডে সুভাষচন্দ্র বোসের বাড়ি এখন নেতাজি ভবন-আবার দর্শনের সুযোগ ঘটে অর্ধশতাব্দী পর। পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্টের মাত্র কয়েক দিনের আনন্দঘন শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে নেতাজি ভবনটি দর্শনে আমার প্রথম সুযোগ হয় ১৯৫৪ সালে। এবারে সঙ্গে ছিলেন আমার স্ত্রী। দ্বিতীয়বার নেতাজি ভবন দর্শনের যে বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল তা হলো ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দিতে যে বাড়ি থেকে নেতাজি একদিন গভীর রাতে উধাও হয়ে যান, সেই বাড়িটার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।

প্রথম ও দ্বিতীয়বারের দর্শনের তুলনা করলে প্রথমেই নজরে পড়ে বাড়িটার অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। মাত্র সামান্য কিছু দক্ষিণা দিয়ে দর্শকেরা দর্শনীয় বস্তুগুলো দেখতে পান, অনেক কিছু জানতে পারেন নেতাজি সম্পর্কে। ঢোকার পথেই রয়েছে ছোট্ট একটা বইয়ের দোকান। দেয়ালে টাঙানো রয়েছে নানা স্মৃতিফলক। টাঙানো জিনিসগুলোর মধ্যে নজরে পড়ে একটা প্লাক। ভারতের মিল ও ভেদের ওপর সুভাষচন্দ্র বোসের দাদা শরত্চন্দ্র বোসের দেওয়া বিখ্যাত বক্তৃতাটা লেখা রয়েছে প্লাকটায়। সুভাষচন্দ্র বোসের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র আর কয়েকটা ছবি ঝুলছে দেয়ালে। বিরাট ফটক দিয়ে বাড়িটাতে ঢুকতেই গাড়ি বারান্দার বাঁ দিকে নজরে পড়ে কাচের একটা বিরাট ঘর। ভেতরে রাখা আছে একটা জার্মান মোটরগাড়ি-ওয়ান্ডারার। গাড়িতে নম্বরপ্লেট লাগানো BLA7169। এই গাড়িতে করেই নেতাজির ভাইপো শিশিরকুমার বোস রাতের গভীর অন্ধকারে প্রহরারত ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে নেতাজিকে মুক্তির পথে পৌঁছে দেন।

শিশিরকুমার বোস ১৯৮৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস নামে একটা বই লেখেন। বইটিতে তিনি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন তাঁর কাকার এই গোপন যাত্রার পূর্ণ বিবরণ। বিবরণে রয়েছে-ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ আর আফগানিস্তানে সাহসিকতাপূর্ণ রোমাঞ্চকর গোটা কাহিনি। তাতে রয়েছে কী করে নেতাজি ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে পৌঁছান জার্মানি ও জাপানে। সে কাহিনি পরে বলব, আসুন, আগে নেতাজি ভবনটা ঘুরে দেখে নিই। দ্রষ্টব্য বস্তুগুলোর বেশির ভাগই রয়েছে দোতলায়। সে তলার ছোট ঘরগুলোর দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে খোলামেলা গ্যালারির মতো তৈরি করা হয়েছে। ঘরে পা দিতেই নজরে পড়ে নেতাজির রাজনৈতিক জীবনের ছবিগুলো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ২০ বছরের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে দেয়ালগুলোর গায়ে গায়ে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে এগুলোতে নজরে পড়ে কলকাতা শহর করপোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন, কলকাতা মেয়রের পদে থাকার স্মৃতি, কংগ্রেস দলে তাঁর কর্মকাণ্ড। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত সময়ে তিনি দু-দুবার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের ইতিহাসে তিনিই হচ্ছেন সবচেয়ে বয়ঃকনিষ্ঠ। কেমব্রিজে পড়াশোনা করার সময়ের ছবিও আছে, আর আছে জেলখাটার দিনের কিছু ছবি। আর একটা ছবিতে দেখা যায় পিতা–মাতা ও প্রিয় ভ্রাতা শরৎ বোসের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, আর একটু এগিয়ে গেলে দেখা যায় একটা জার্মান সাবমেরিন। তার ডেকে যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন মুসেনবার্গের সঙ্গে। সবচেয়ে নাটকীয় ছবিটা হচ্ছে ১৯৪৩ সালে উত্তাল বিক্ষুব্ধ ভারত মহাসাগরে জার্মান সাবমেরিন থেকে নেতাজির জাপানি সাবমেরিন বদল। আর সর্বক্ষণ ভিডিও চলছে সুভাষ বোসের আবেগময় দেশপ্রেমিক বক্তৃতা, আইএনএ বাহিনীর প্যারেড, রেঙ্গুন ও সিঙ্গাপুরের সমাবেশ। সুভাষ বোসের চিঠিপত্রসহ স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যান্য দলীয় পত্র, তাঁর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। জামাকাপড়, তার আইএসএর ইউনিফর্ম, বুট ইত্যাদি শোভা পাচ্ছে অন্যদিকে।

শিশিরকুমার বোস ১৯৮৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস নামে একটা বই লেখেন। বইটিতে তিনি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন তাঁর কাকার এই গোপন যাত্রার পূর্ণ বিবরণ। বিবরণে রয়েছে ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ আর আফগানিস্তানে সাহসিকতাপূর্ণ রোমাঞ্চকর গোটা কাহিনি। তাতে রয়েছে কী করে নেতাজি ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে পৌঁছান জার্মানি ও জাপানে।

১৯২০ সালে সুভাষচন্দ্র বোস আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান দখল করেন। কিন্তু আইসিএস অফিসার হওয়ার বদলে তিনি ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে তখনকার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া, ইএস মোস্টাওকে লেখা এক চিঠিতে আইসিএস প্রবেশনদের পদ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন। তাঁর এই ‘খামখেয়ালিপনা’ সিদ্ধান্তের বর্ণনা করে তিনি তাঁর দাদা শরৎ বোসকে যে চিঠি লেখেন, হাতে লেখা সেই চিঠিটাও দেয়ালে ঝুলছে। চিঠিতে তিনি লেখেন, ত্যাগ স্বীকার করে এগিয়ে চলার সময় এসেছে এখন। তিনি আরও লেখেন, ‘এই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আমার শুধু একটিমাত্র প্রার্থনা, আমার প্রিয় দেশের মঙ্গল হোক।’ তখন থেকেই সুভাষ বোস বেছে নিলেন আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণতার পথ। দর্শক গ্যালারির অন্য প্রান্তে রয়েছে নেতাজি ও পিতা জানকীনাথ বোসের তখনকার দিনের আসবাবপত্রসহ শোবার ঘর দুটো। এই ঘর থেকেই সুভাষ বোস উধাও হয়ে যান।

স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করতে সুভাষ বোস কীভাবে উধাও হয়ে যান, তার চমকপ্রদ কাহিনি বর্ণনা করেছেন শিশির বোস তাঁর বইয়ে। ১৯৪০ সালে নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ সরকার স্বাস্থ্যগত কারণে সুভাষ বোসকে কারাবাস থেকে মুক্তি দেয়। এর কিছু পরই গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর শেষ পত্রবিনিময় হয়। পত্রে সুভাষ বোস গান্ধীজিকে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার অঙ্গীকার করে বলেন, স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে তিনি অহিংস পথও গ্রহণ করতে রাজি। সুভাষ বোসের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গান্ধীজি লেখেন, তাদের মতাদর্শে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সুভাষ বোসকে তাঁর নিজের পথেই চলতে হবে। নেতাজিও ঠিক তা–ই করলেন। নিজের মতমতো চলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি পরিকল্পনা করতে বসলেন। পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ হলো ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

সুভাষ বোস তাঁর পরিকল্পনার কথা তাঁর দুই বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানান। একজন হলেন ভাইপো শিশির, আর অন্যজন হলেন পেশোয়ারের ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা মিয়া আকবর শাহ। তাঁর পরিকল্পনা হলো উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতীয় এলাকা দিয়ে ভারতবর্ষের বাইরে চলে যাওয়া। ঠিক হলো উত্তর প্রদেশের জনৈক মুসলমানের বেশ ধরে, মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন নাম নিয়ে, ভ্রাম্যমাণ এক বিমা কোম্পানির ইন্সপেক্টর সেজে সুভাষ বোস যাত্রা শুরু করবেন। শরৎ বোস পরিকল্পনাটা পরীক্ষা করে দেখে কিছু রদবদল করে তাঁর মত দিলেন। যাত্রার কয়েক দিন আগে সুভাষ বোস নিঃসঙ্গ বসবাস করার ঘোষণা করলেন, কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, কথা বলবেন না, এমনকি টেলিফোনও না। সুভাষ বোস তাঁর ঘরের চারদিকে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। তাঁর খাবারদাবার পর্দার নিচে দিয়ে চালান করে দেওয়া হতো। এসবের একটা কারণ হলো কেউ কেউ সন্দেহ করতে শুরু করছিলেন যে চাকরবাকরদের মধ্যে কেউ হয়তো পুলিশের চর হিসেবে ঢুকে পড়েছে। যাত্রার দিন রাতের খাওয়া তিনি তাঁর মা প্রভাবতী দেবীর সঙ্গেই খান। তারপর যে যাঁর ঘরে শুতে চলে গেলে ১৭ জানুয়ারি ১৯৪১ সাল রাত দেড়টায় শিশির বোসের চালানো গাড়িতে করে সুভাষ বোস বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর পরনে ছিল লম্বা শেরওয়ানি, ঢোলা পাজামা, পায়ে ফিতাওয়ালা ইউরোপীয় জুতা আর মাথায় কালো পশমি টুপি।

পত্রে সুভাষ বোস গান্ধীজিকে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার অঙ্গীকার করে বলেন, স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে তিনি অহিংস পথও গ্রহণ করতে রাজি। সুভাষ বোসের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গান্ধীজি লেখেন, তাদের মতাদর্শে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সুভাষ বোসকে তাঁর নিজের পথেই চলতে হবে। নেতাজিও ঠিক তাই করলেন।

গ্র্যান্ডট্রাঙ্ক রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়ে তাঁরা যখন আসানসোলে পৌঁছান, তখন ভোর হয়ে গেছে। গাড়িতে তেল ভরে আবার যাত্রা শুরু। কিছুক্ষণ পর তাঁরা গিয়ে পৌঁছান বারারি। বারারিতে সপরিবার থাকতেন শরৎ বোসের জ্যেষ্ঠ পুত্র অশোক। বিমা কোম্পানির লোক হিসেবে তিনি বাইরের ঘরেই বসলেন। উদ্দেশ্য হলো চাকরবাকর পর্যন্ত যেন কোনো সন্দেহ না করে। কিছুক্ষণ পর অতিথি সাজা সুভাষ বোস পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েন। একটু পরে পেছন থেকে অশোক গাড়ি নিয়ে এসে তাঁকে তুলে নিয়ে গোমহ রেলস্টেশনে নামিয়ে দেন। গোমহ থেকে যাবেন তিনি দিল্লি। দিল্লিতে ট্রেন বদল করে ফ্রন্টিয়ার মেল ধরে যাবেন পেশোয়ার। গোমহ রেলস্টেশনে সুভাষ বোস নিজেই টিকিট কিনে ফার্স্ট ক্লাস কামরায় উঠে বসলেন। পেশোয়ার পৌঁছাতে দুই দিন লেগে গেল। ১৯ জানুয়ারি আকবর শাহ স্টেশন থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে তুললেন আবাদ খানের বাড়িতে। আবাদ খান উপজাতীয় এলাকা দিয়ে গোপন পথে চলাচলে একেবারে ওস্তাদ। আবাদ খানের বাড়িতেই কয়েক দিন থেকে তাঁর কাছ থেকেই সুভাষ বোস পাঠানদের চালচলন, আচার-ব্যবহার রপ্ত করে নেন।

কাবুলে সোভিয়েত, ইতালিয়ান ও জার্মান দূতাবাসসমূহের সঙ্গে সব জোগাড়-যন্ত্র করতে করতে কেটে গেল দুই মাস। এই দুই মাস নেতাজির জীবনে খুবই হতাশপূর্ণ মানসিক যন্ত্রণার দিন বলতে হয়। ওই সব দেশের কর্মকর্তাদের তিনি প্রথম থেকেই তাঁর উদ্দেশ্যের কথা বলেন। ইতালিয়ান, জার্মানদের তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউরোপে একটা স্বাধীন ভারত সরকার গঠন করা এবং ইতালিয়ান ও জার্মানদের হাতে ধরা পড়া ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিবারেশন আর্মি গঠন করা।
নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু

১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোরবেলা সুভাষ বোস যাত্রার জন্য আবার প্রস্তুত। এবার তিনি সেজেছেন মূক ও বধির এক পাঠান। তিনজন গাইড নিয়ে একটা মোটরগাড়ি করে চললেন আফরিদি উপজাতীয়দের সীমান্তের দিকে। সীমান্তের কাছাকাছি এসে মোটরগাড়ি ছেড়ে কখনো গরুর গাড়িতে, কখনো পায়ে হেঁটে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে চললেন সুভাষ বোস। কোথাও কোথাও পর্বতশৃঙ্গ তুষারে ঢাকা রয়েছে। ২৮ জানুয়ারি সুভাষ বোস আফগানিস্তানের একটা গ্রামে এসে পৌঁছান। জালালাবাদ শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। যাত্রাও ছিল রোমাঞ্চকর। কখনো গাধার গাড়ি, কখনোবা চায়ের পেটি বহনকারী ট্রাক চেপে চললেন নেতাজি। ৩০ জানুয়ারি আবার শুরু হলো যাত্রা। এবার বাহন হলো টাঙ্গা আর গন্তব্যস্থল কাবুল। কিছু দূর গিয়ে টাঙ্গা বদল করে চেপে বসলেন এক ট্রাকে। কাবুল পৌঁছালেন ৩১ জানুয়ারি। কাবুলে নেতাজি এক সরাইখানায় গিয়ে উঠলেন। লাজেরি গেটের কাছে এই সরাইখানাটাকে এক অতি অতিথিপরায়ণ সরাইখানা বলা যায়। ওই সরাইখানায় এক আফগান পুলিশ বারবার এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা বলতে থাকে। মনে হলো পুলিশ বুঝি কিছু আঁচ করেছে। নেতাজি হাতের ঘড়িটা খুলে দিয়ে খুশি করে বিদায় দিলেন পুলিশকে। এবার তাঁর গন্তব্য হলো সেন্ট্রাল ইউরোপ। যেতে হবে মস্কো হয়ে। কাবুলে সোভিয়েত, ইতালিয়ান ও জার্মান দূতাবাসসমূহের সঙ্গে সব জোগাড়-যন্ত্র করতে করতে কেটে গেল দুই মাস। এই দুই মাস নেতাজির জীবনে খুবই হতাশপূর্ণ মানসিক যন্ত্রণার দিন বলতে হয়। ওই সব দেশের কর্মকর্তাদের তিনি প্রথম থেকেই তাঁর উদ্দেশ্যের কথা বলেন। ইতালিয়ান, জার্মানদের তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউরোপে একটা স্বাধীন ভারত সরকার গঠন করা এবং ইতালিয়ান ও জার্মানদের হাতে ধরা পড়া ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিবারেশন আর্মি গঠন করা।

১৭ মার্চ সুভাষচন্দ্র মোটরগাড়ি করে আবার যাত্রা শুরু করেন সোভিয়েত সীমান্তের দিকে। সঙ্গে ছিলেন তিন জার্মান। আফগান সীমান্ত পার হয়ে তাঁরা গিয়ে পৌঁছালেন সামারখন্দে। সামারখন্দ থেকে ট্রেনে করে গিয়ে উঠলেন মস্কোতে। মস্কো থেকে বিমানে করে যেদিন বার্লিনে গিয়ে পৌঁছান, সেদিন ছিল ২ এপ্রিল ১৯৪১।

৩১ মার্চ কলকাতার ১ নম্বর উডবার্ন পার্কে তাঁর বাড়িতে শরৎ বোস এক সংবাদ বাহকের মারফতে সুভাষ বোসের একটা চিঠি পান। এরপর দুই ভাইয়ের মধ্যে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন ছিল ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এই যোগাযোগ চলত গোপনে, টোকিও হয়ে কলকাতার জাপানি কনস্যুলেট জেনারেলের মাধ্যমে।

নেতাজি সম্পর্কে একটা ছোট কাহিনি উল্লেখ করে এবার শেষ করি। ১৯৩৫ সালে ইউরোপে থাকার সময় সুভাষ বোসের গলব্লাডার অপারেশন করতে হয়। তখনকার দিনে গলব্লাডার অপারেশনও বেশ বড় ব্যাপার। তাঁকে বলা হলো তোমার শেষ ইচ্ছা লিখে রাখো। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস যা লিখলেন তা তাঁর মতো দেশপ্রেমিকেরাই লিখতে পারেন। তিনি লিখলেন, ‘আমার যত সম্পদ তা সব যাবে আমার দেশবাসীর কাছে, আর আমার যত ঋণ তা সব যাবে আমার ভাই শরতের কাছে।’

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন ওয়াহেদ হোসেনী

সূত্র: প্রথম আলো