জাপানে মোট বিচ্ছেদ কমলেও বাড়ছে সিলভার ডিভোর্স, কয়েক দশক সংসার কররে অর্ধেক পেনশন পেয়েই কেন আলাদা হচ্ছেন নারীরা
গণমাধ্যম ডেক্স
‘সিলভার ডিভোর্স’ বলতে সাধারণত দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনের পর, বিশেষ করে ২০ বছর বা তার বেশি সময় সংসার করার পর বিচ্ছেদকে বোঝানো হয়। জাপানে মোট বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা কমলেও দীর্ঘদিনের দাম্পত্য ভাঙার ঘটনা বাড়ছে কেন?
একসঙ্গে কাটিয়েছেন ২০, ৩০ কিংবা তারও বেশি বছর। সন্তান বড় করেছেন, সংসার সামলেছেন, জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছেন। অথচ সন্তানরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ মনে হচ্ছে, পাশে থাকা মানুষটির সঙ্গে যেন আর কোনো সম্পর্কই অবশিষ্ট নেই।

এমন উপলব্ধি থেকেই জীবনের ষাটের কোঠায় এসে বিয়ের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসছেন জাপানের অনেক নারী। দেশটিতে বাড়ছে ‘সিলভার ডিভোর্স’।
‘সিলভার ডিভোর্স’ বলতে সাধারণত দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনের পর, বিশেষ করে ২০ বছর বা তার বেশি সময় সংসার করার পর বিচ্ছেদকে বোঝানো হয়। একে জাপানি ভাষায় বলা হচ্ছে 'জুকুনেন রিকন'।
জাপানে মোট বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা কমলেও দীর্ঘদিনের দাম্পত্য ভাঙার ঘটনা বাড়ছে। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বিবাহিত দম্পতিদের বিচ্ছেদ মোট বিবাহবিচ্ছেদের ২৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।

আগের বছরের তুলনায় এই হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় কম। এই বৈপরীত্য আসলে অনেক কারণের ফলাফল।
সন্তানই ছিল সম্পর্কের যোগসূত্র
৬২ বছর বয়সী আয়ুমির অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। জাপানের কাওয়াসাকি শহরের বাসিন্দা এই নারী দুই দশকের বেশি সময় সংসার করেছেন। স্বামী কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আর তিনি সামলাতেন ঘর ও দুই মেয়েকে। সন্তানদের বড় করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর খরচ এবং পরিবারের নানা দায়িত্ব পালনে কেটে গেছে বছরের পর বছর।

কিন্তু মেয়েরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর দুজনের মধ্যে দূরত্বটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আয়ুমির ভাষায়, একসময় মনে হতে থাকে, তাঁরা যেন পরস্পরের অপরিচিত মানুষ। স্বামী প্রায় এক বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখন বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
আর্থিক স্বাধীনতা বদলে দিচ্ছে আফটারম্যাথ
জাপানে নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়া এই প্রবণতার অন্যতম কারণ। আগের প্রজন্মের অনেক নারী সংসার ও সন্তান পালনে জীবন কাটিয়েছেন। নিজের উপার্জন না থাকায় অসুখী দাম্পত্যেও তাঁদের থেকে যেতে হতো। ২০০৭ সালে জাপানের পেনশন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।

এর ফলে বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের সময়কালের কর্মচারী পেনশন ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নির্দিষ্ট শর্তে একজন সাবেক স্বামী বা স্ত্রী অন্যজনের পেনশন-সুবিধার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। অবসরের পর আর্থিক নিরাপত্তার এই আফটারম্যাথ অনেক নারীর কাছে নতুন আশ্বাস হয়ে উঠেছে।
তানশিন ফুনিন
এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও বদলির সংস্কৃতিও দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে।‘তানশিন ফুনিন’নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় চাকরির প্রয়োজনে অনেক পুরুষকে বছরের পর বছর অন্য শহর বা দেশে থাকতে হয়। সন্তানদের স্কুল ও পরিবারের সুবিধার কথা ভেবে স্ত্রী থেকে যান বাড়িতে। ফলে একই ছাদের নিচে না থেকেও অনেক দম্পতির সংসার চলে বছরের পর বছর। অবসরের পর একসঙ্গে থাকার সময় এলে বোঝা যায়, তাঁদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব কতটা বেড়েছে।
একাকিত্বের ভয়, তবু আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত
তবে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে ফেলা সহজ নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে একাকিত্ব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। টোকিওভিত্তিক কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান টেলের ক্লিনিক্যাল পরিচালক বিল ক্লিয়ারির মতে, সন্তান বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর অনেক দম্পতি হঠাৎ একে অপরের মুখোমুখি হন। তখন বুঝতে পারেন, তাঁদের মধ্যে কথা বলার মতো বিষয়ও খুব বেশি অবশিষ্ট নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের সমস্যা দীর্ঘদিন জমতে না দিয়ে প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া জরুরি। কারণ বিচ্ছেদই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। আয়ুমির মতো অনেক নারী অবশ্য জীবনের এই পর্যায়ে নতুন করে নিজের মতো বাঁচার সাহস খুঁজছেন। তিনটি খণ্ডকালীন কাজ করেন তিনি। মেয়েদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত নন, তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস তাঁর আছে। জাপানের এই প্রবণতা শুধু বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যানের গল্প নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়, দীর্ঘ দাম্পত্যের পরও একজন নারীর নিজের জীবন, স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
ছবি: ইন্সটাগ্রাম ও পেকজেলস
সূত্র: প্রথম আলো